kalerkantho


কালের কণ্ঠ-মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

নারীর সমমর্যাদা নিশ্চিতে মানসিকতার বদল জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নারীর সমমর্যাদা নিশ্চিতে মানসিকতার বদল জরুরি

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার কনফারেন্স রুমে গতকাল ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা, পরিবর্তনের দৃপ্ত অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রতিটি ঘরে কিংবা সমাজে নারীর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে চাইলে সবার মনোজগতে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন দেশের নারীনেত্রী ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাঁদের মতে, গৃহস্থালির কাজ শুধু নারীই নয়, করতে হবে পুরুষকেও। একই সঙ্গে গৃহস্থালির কাজের আর্থিক মূল্য আলাদাভাবে বের করে জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন নারী নেত্রীরা। গতকাল সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্স রুমে দৈনিক কালের কণ্ঠ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উঠে আসে কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও। গোলটেবিল বৈঠকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ নারী নেত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তনু হত্যার বিচার শুরু হয়নি। এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। জাতির জন্য তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। বিয়ের বয়স নিয়ে সম্প্রতি সংসদে যে আইন পাস হয়েছে, সেটিরও কঠিন সমালোচনা করেন নারী নেত্রীরা।

‘মর্যাদায় গড়ি সমতা; পরিবর্তনে দৃপ্ত অঙ্গীকার’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। অলোচনায় অংশ নেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল করিম, বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আফজাল হোসেন, ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিষ কুমার চক্রবর্তী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপচিত্র বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জয়া শাহ্রীন হক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর বনশ্রী মিত্র নিয়োগী, ব্র্যাক এডুকেশন প্রোগ্রামের কনসালট্যান্ট কামরুন্নেসা হাসান, সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট শাহিদা পারভীন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জলি তালুকদার, বাংলাদেশ নারী প্রগতির উপপরিচালক শাহনাজ সুমি, পর্বতারোহী এম এ মুহিত, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক, পিকেএসএফের মহাব্যবস্থাপক হাসনাহেনা খান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সদস্য মাহমুদা খাঁসহ অন্যরা।

গোলটেবিল বৈঠকে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানেই সবার সমান অধিকার ও মর্যাদার বিধান করা হয়েছে। এখন এর কোনোটারই বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আইন হলেও বাস্তবায়ন নেই। নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতে জাতিসংঘ প্রণীত সিডিও সনদ বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি অনুমোদন করেনি, এর দুটি অনুচ্ছেদ এখনো ‘সংরক্ষণ’ রেখেছে। ওই দুই অনুচ্ছেদের একটিতে সম্পত্তিতে নারীকে সমান অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্পত্তিতে সমান অধিকার না দেওয়া পর্যন্ত নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিবাহের ক্ষেত্রে নারী এখনো একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিডিওর বিষয়ে সরকার জাতিসংঘকে সম্প্রতি জানিয়েছে, এর সংরক্ষণ করা দুই অনুচ্ছেদে অনুমোদন দিতে সমাজ এখনো প্রস্তুত নয়। কাজী রিয়াজুল হক বলেন, শেখ হাসিনার সরকার আমলে নারীর অভুতপূর্ব উন্নয়ন এবং নারীরা ক্ষমতাবান হয়েছে। ফলে নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সবার মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, নারীর বিভিন্ন অধিকার নিয়ে এখন আমরা কথা বলি। কিন্তু আমাদের ঘরের মধ্যে যে সমস্যাগুলো রয়ে গেছে, অনাদিকাল ধরেই নারীর যে মর্যাদা বা অবদান, তা অস্বীকৃতই রয়ে গেছে। এ ছাড়া সংসার, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা বরাবরই উপেক্ষিত হতে দেখি। এ শতাব্দীতেও প্রতিদিন খবরের পাতায় নারীর ওপর নির্যাতন-সংক্রান্ত যেসব খবর আমরা দেখি, তা গা শিউরে ওঠার মতো।

তিনি বলেন, দৈনিক কালের কণ্ঠ শুরু থেকেই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতেও তা অব্যাহত থাকবে। ইমদাদুল হক মিলন বলেন, মানুষের পরিবর্তন হয় ঘর থেকে, চেতনা থেকে ও তার চারপাশ থেকে। আমাদের এই জায়গাগুলোতে সমস্যা রয়েই গেছে। তারপরও আশার কথা, অনেক মানবাধিকার সংগঠন নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে, লেখালেখি হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি এবং পরিত্রাণের একটি উপায় বের হবে।

শাহীন আনাম বলেন, ‘দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, সংসার বা সমাজে নারীর মর্যাদা পুরুষের চেয়ে কম। নারীর মর্যাদা পুরুষের সমান হলে, সমাজ ও সংসারে নারীরা এতটা বৈষম্যের শিকার হতো না। ’

বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, ‘সব ক্ষেত্রে নারীর অবদান রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি থেকে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান রয়েছে। নারী এত কিছু করলেও তার মর্যাদাপূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নেই। ’

আবদুল করিম বলেন, সবার সমান মর্যাদার কথা সংবিধানে বলা রয়েছে। আবার আইনও রয়েছে। এ কোনোটিরই বাস্তবায়ন নেই। এ ছাড়া নারীর সমান অধিকার বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জাতিসংঘের সিডিও সনদ বাংলাদেশ এখনো পুরো অনুমোদন করেনি।

আফজাল হোসেন বলেন, নারীর সমান মর্যাদা ও অধিকার বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে শুধু মৌলবাদকেই দায়ী করা ঠিক নয়। ৪৬ বছর ধরে একটু একটু করে সংস্কৃতিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। এখন দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নারী পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে, একই সঙ্গে নতুন নতুন অনেক সংকটেরও সৃষ্টি হয়েছে।

শাহিদা পারভীন বলেন, পরিবার থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে নারী অবদান রাখলেও তা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। যেসব শ্রমের অর্থমূল্য লেনদেন করা যায়, শুধু সে সবই জিডিপিতে গ্রহণ করা হয়। নারীর সব শ্রমকে অর্থমূল্য ও মর্যাদা দিয়ে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান তিনি।

জয়া শাহরীন হক বলেন, নারী আসলে শক্তিশালী। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নারীবান্ধব করতে পারলে, নারী অনেক কিছুই করতে পারবে।

ডা. আশিষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ’নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর সমান মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়টি পরিবার থেকেই আগে নিশ্চিত করতে হবে। ’ এম এ মুহিত বলেন, ‘নারীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সবার মানসিকতা পরিবর্তন আবশ্যক। ’ নাসিমুন আরা হক বলেন, ‘উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত নারীর সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ’


মন্তব্য