kalerkantho


ভুয়া অভিযোগের ছড়াছড়ি দুদকে!

রেজাউল করিম   

২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভুয়া অভিযোগের ছড়াছড়ি দুদকে!

মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অন্যকে ফাঁসানোর চেষ্টা করার অভিযোগে মো. আহসান হাবিব নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১২ মার্চ। তিনি বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির ক্রেডিট সুপারভাইজার ছিলেন। ওই একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম খান ও পরিচালক মো. মাহমুদুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে তিনি ঘুষ নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করেছিলেন দুদকে। অভিযোগে তিনি বলেছিলেন, ২০০৮ সালে একাডেমির রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওই পদে নিয়োগ দিতে তাঁর কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নেন একাডেমির ওই দুই কর্মকর্তা। অনুসন্ধানে দুদক জানতে পারে, ২০০৮ সালে একাডেমি এ রকম কোনো বিজ্ঞপ্তিই দেয়নি। আহসান হাবিব এমন আবেদনও করেননি।

অনুসন্ধানে দুদক আরো জানতে পারে, আহসান হাবিব ২০০৬ সালের মার্চ থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত ক্রেডিট সুপারভাইজার হিসেবে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির আওতাধীন একটি উপপ্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় প্রকল্পের সুবিধাভোগী সদস্যদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয় বাবদ পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ৩১৪ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২০১৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে, যা তদন্ত করছে দুদক। এ অবস্থায় দুদক আইন-২০০৪-এর‘গ’ ধারা অনুযায়ী আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দুদক সূত্রে জানা যায়, দুদকে আসা বেশির ভাগ অভিযোগই ওই রকম বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তাই জমা হওয়ার পর বেশির ভাগ অভিযোগই বাতিল হয়ে যায় যাচাই-বাছাইয়ে। খুব কমসংখ্যক অভিযোগই অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুদকে প্রায় দেড় হাজার অভিযোগ জমা হলেও অনুসন্ধানের জন্য মাত্র ১৩৬টি আমলে নেওয়া হয়েছে। আর অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়েছে মাত্র ১৪টি। ২০১৬ সালে দুদকে জমা হয় ১২ হাজার ৯৯০টি অভিযোগ। এসবের মধ্যে মাত্র এক হাজার সাতটি অর্থাৎ ৭.৭৫ শতাংশ অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয়। বাদ পড়ে ৯২.২৫ শতাংশ অভিযোগ। অনুসন্ধান শেষে দুদক মামলা করে ৩৪০টি।

দুদকের ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছর মোট ১০ হাজার ৪১৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এক হাজার ২৪০টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। এর আগের বছর ২০১৪ সালে অভিযোগ জমা পড়েছিল ১২ হাজার ৫০০টি। এসবের মধ্যে এক হাজার ৬৮৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়।

দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দুদকে আসা অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে তা প্রথমত অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পরে সেটি তদন্ত করে দুদক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তিনি আরো বলেন, দুদকের একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেখা গেছে, অধিকাংশ অভিযোগই তফসিলবহির্ভূত।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, দুদকে প্রতি মাসে গড়ে হাজারখানেক অভিযোগ জমা হয়। সেগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য বাছাই করে দুদকের বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগটি দুদকের তফসিলভুক্ত কি না। এ ছাড়া যিনি অভিযোগ করেন তাঁর নাম-ঠিকানা, পরিচয়, টেলিফোন নম্বর যথার্থ কি না, সেটা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ কি না তাও দেখা হয়। শত্রুতাবশত অযথা হয়রানির উদ্দেশ্যে অভিযোগটি দেওয়া হয়েছে কি না সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। পরে দেখা হয়, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁর দপ্তর, দাপ্তরিক মর্যাদা, বর্ণিত অপরাধ করার ক্ষমতা ও সুযোগ আছে কি না। অভিযোগটি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ ও দুর্নীতি দমন বিধিমালা-২০০৭ মোতাবেক কাজ শেষে আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যাবে কি না, প্রমাণে কী পরিমাণ অর্থ, শ্রম, মেধা, সময় ও উপকরণ প্রয়োজন হবে তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, বেশির ভাগ অভিযোগই যাচাই-বাছাইয়ে ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বালাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্নীতি দমনের প্রক্রিয়া শুরু হয় সাধারণত কারো বিরুদ্ধে আসা কোনো অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে। দুদক স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান করতে পারে এবং মামলাও করতে পারে। দেখা যায়, দুদকে বেশির ভাগ অভিযোগই দাখিল হয় ব্যক্তির দ্বারা। অনেকেই অন্যকে ফাঁসাতে বা বিব্রত করতে দুদকে অভিযোগ করে থাকে। ফলে অনুসন্ধানের জন্য সেগুলো দুদক গ্রহণ করে না।



মন্তব্য