kalerkantho


প্রধান বিচারপতি বলেন

বিচার বিভাগ সম্পর্কে ভুল বোঝানো হচ্ছে সরকারপ্রধানকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিচার বিভাগ সম্পর্কে ভুল বোঝানো হচ্ছে সরকারপ্রধানকে

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএসসি) অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, সরকারপ্রধানকে বোঝানো হচ্ছে যে বিচার বিভাগ প্রশাসনের প্রতিপক্ষ। কিন্তু বিচার বিভাগ কোনো দিনই সরকার বা প্রশাসনের প্রতিপক্ষ হয়নি।

সরকারপ্রধানকে ভুল রিপোর্ট দেওয়ায় বিচার বিভাগ নয়, বরং প্রশাসনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের ছোট ছোট সমস্যা সরকারপ্রধানের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। ফলে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, নিম্ন আদালতগুলোতে বিচারকশূন্যতা নিয়ে সরকারকে সময়মতো চিঠি দেওয়া হলেও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের ইউনিয়ন পর্যন্ত ডিজিটালাইজেশন-প্রক্রিয়া চললেও বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনে টাকা দেওয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএসসি) অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। গতকাল শনিবার বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সেমিনার হলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বিজেএসসির চেয়ারম্যান ও আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি খোন্দকার মূসা খালেদ, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জি, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সচিব পরেশ চন্দ্র শর্ম্মা। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহীরা এখন থেকে www.bjsc.gov.bd—এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে অলাইনে রেজিস্টেশন করতে পারবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সংবিধান ও আইনে বিচার বিভাগকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, সে অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া হলে দেশে দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা, এমনকি সন্ত্রাসমূলক কাজ অনেকাংশে চলে যাবে। আশা করি সরকার এবং প্রশাসন এটা উপলব্ধি করবে। ’

প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রত্যেকটি সরকার যেহেতু রাজনৈতিক সরকার। তাই কিছুটা বাড়াবাড়ি হবে। যখনই দেখা যাবে রাজনৈতিক সরকার ও নেতাদের দ্বারা শাসতন্ত্রে যা বলা আছে তা ঠিকমতো হচ্ছে না, তখনই সুপ্রিম কোর্ট এগিয়ে আসবেন। না হলে সে দেশে সভ্যতা থাকবে না।

প্রধান বিচারপতি আমেরিকার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ট্রাম্প ন্যক্কারজনকভাবে বিচার বিভাগের সমালোচনা করছেন। কিন্তু আমেরিকার বিচার বিভাগ চুল পরিমাণ নড়েনি। ভারতেও এই বিচার বিভাগ প্রতিটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। বিচার বিভাগের ক্ষতির জন্য বিচার বিভাগের কিছু লোককে দায়ী করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে বিচার বিভাগের যত ক্ষতি করেছে তা আমাদের বিচার বিভাগের কিছু লোক। আমরাই বেশি ক্ষতি করেছি। ’

প্রধান বিচারপতি মামলাজটের জন্য পরোক্ষভাবে প্রশাসনকে দায়ী করে বলেন, ‘আমাদের বিচারকস্বল্পতা রয়েছে। জেলা জজ ছয়টি, অতিরিক্ত জেলা জজ ৯টি, যুগ্ম জেলা জজ ১৬টি, সহকারী জজ পর্যায়ে ১২৩টি ও জুডিশিয়াল সার্ভিসে ১৫৯টি পদ খালি। সর্বমোট ৩০৭টি পদ খালি। এই বিচারকশূন্যতা নিয়ে আমরা সময়মতো সরকারকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু সহযোগিতা পাই না। ’

অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম আগেই চালু হওয়া দরকার ছিল মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, সরকারের যেসব ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে, তার পেছনে অনেক টাকাও ব্যয় করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনের জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে না। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ডিজিটালাইজেশনের জন্য ইউএনডিপির সাহায্য নিতে হচ্ছে, এটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর আয় করা হচ্ছে। কিন্তু এক হাজার টাকা ব্যয় করারও বাজেট প্রধান বিচারপতির কাছে নেই।

 

বিচার বিভাগের সফলতার কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত বিচার বিভাগের যত অর্জন, তা কোনো দিনই প্রশাসন দেয়নি, বরং জুডিশিয়ালের প্রনাউন্সমেন্ট (রায়) দ্বারা অর্জন করেছি। ’ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে বিচার বিভাগের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে (ট্রাইব্যুনালের) এই বিচার নিয়ে সমালোচনা হলেও এখন এই রায়গুলো নিয়ে পৃথিবীর কোথাও সমালোচনা হচ্ছে না। এ ছাড়া প্রকল্পের কর্মচারীদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার সীমাবদ্ধতা, দুদক আইনের সংশোধনী, চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে গাইডলাইন তৈরি, মেডিক্যাল ভর্তির গাইডলাইন তৈরি—এ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্ট এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি।


মন্তব্য