kalerkantho


পদ্মা সেতু দৃশ্যমান করতে পাঁচটি স্প্যান বসানো হচ্ছে শিগগিরই

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আগামী জুলাই মাসে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ১২ বিদেশি বিশেষজ্ঞের মতামতের পর এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ক্রাশ প্রগ্রাম গ্রহণ করা হয়েছে। জাজিরা প্রান্তের ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পিলারে দ্রুততম সময়ে পাঁচটি স্প্যান বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে স্প্যান বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজ শেষ হলে সেতুর ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হবে।

জানা যায়, ইতিমধ্যেই লোড টেস্ট করে প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আরো দুটি স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। লৌহজংয়ের পদ্মা সেতুর ওয়ার্কশপে ছয়টি স্প্যান রয়েছে। এগুলো পর্যায়ক্রমে জোড়া দিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। চীন থেকে মাওয়ায় আসার জন্য সমুদ্রপথে রয়েছে আরো দুটি স্প্যান।

চীনে তৈরি করা রয়েছে আরো ১৮টি স্প্যান। পাইল স্থাপনে কাজের নতুন গতি সৃষ্টি হওয়ায় মূল সেতুর পুরো কাজের গতি বেড়েছে অনেক গুণ। একই সঙ্গে পাইলের টিউবও তৈরি রয়েছে বহুসংখ্যক। সেতুর জন্য ২৪০টি টিউব প্রয়োজন হলেও ইতিমধ্যে ১৯২টি টিউব তৈরি প্রায় সম্পন্ন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, একযোগে পাঁচটি স্প্যান স্থাপনের পরই সেতুর মূল চেহারার একটি অংশ ভেসে উঠবে। এরপর ধীরে ধীরে আরো ৪০টি স্প্যান বসবে সেতুর পিলারের ওপর। প্রতিটি স্প্যানের ওজন প্রায় দুই হাজার ৯০০ টন। আর এই স্প্যান বহনের জন্য দেশের সবচেয়ে বেশি তিন হাজার ৬০০ টন ক্ষমতার ভাসমান ক্রেন প্রস্তুত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গড়ে সেতুর ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচটি স্প্যান একযোগে পিলারের ওপর বসানো হলে সেতুর কাজ গড় হারে একটা বড় পরিবর্তন ঘটবে। সেই সময়ে কাজের অগ্রগতি বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।

পদ্মা সেতুর দায়িত্বশীল এক প্রকৌশলী জানান, প্রবল স্রোতের বৈচিত্র্যময় পদ্মার তলদেশের মাটিতেও নানা বৈচিত্র্যতা ছিল। এতে পাইলিংয়ের সময় নানা প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয়। মাটির নানা রূপ-বৈচিত্র্যতার কারণে কোথায় গিয়ে পাইলিং শেষ করা হবে তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই বিশ্বের প্রথম এই ব্যতিক্রম এবং বেশি গভীরে পিলার স্থাপন করে তৈরি করা হচ্ছে পদ্মা সেতু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আরেক ধাপ অতিক্রম করছে।

এদিকে পদ্মা সেতুর বেইজ গ্রাউন্ড সমস্যার সমাধান দিয়ে বিদেশি ১২ বিশেষজ্ঞ ফিরে গেছেন। পদ্মায় সেতুর পাইলের বেইজ গ্রাউন্ড কংক্রিটিংয়ে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। তাই বিদেশি ১২ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞদল তলব করে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কম্পানি। এখন এই সমস্যা সমাধানের পর পুরোদমে পাইলের কাজ চলছে।

এ পর্যন্ত মূল সেতুর বটম পাইল হয়েছে ৫০টি। এ ছাড়া জাজিরা প্রান্তে ভায়াডাক্টের পাইল স্থাপনে হাফ সেঞ্চুরি অতিক্রম করেছে। এই সংযোগ সেতুর ৫৫টি পাইলেরই কংক্রিটিং শেষ হয়ে গেছে। পুরোদমে এখানে কাজ চলছে। এখন কাজের এই গতি মাওয়া প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে। মাওয়া প্রান্তে ভায়াডাক্টের (সংযোগ সেতু) পাইল স্থাপন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দীর্ঘ এক বছর বন্ধ থাকার পর মার্চের প্রথম সপ্তাহে মাওয়া প্রান্তের নদীতে ৪ ও ৫ নম্বর পিলারের বটম সেকশন পাইল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এই প্রান্তে ৬ ও ৭ নম্বর পিলারে তিনটি করে পাইলের বটম সেকশন সম্পন্ন করে স্রোতের কারণে এই পাইলের কাজ জাজিরা অংশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল গত বর্ষার আগে। প্রথম পিলার (ট্রানজেকশন পিলার) মাওয়া প্রান্তে ১ নম্বর পিলারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডিজাইন চূড়ান্ত হয়েছে। মাওয়ায় এখন পুরোদমে পাইল স্থাপনের কাজ চলছে। নিশি রাতে পাইলের ওপর হামারের আছড়ে পড়া আওয়াজ চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরের গ্রামের লোকজনও শুনতে পাচ্ছে।

এ ছাড়া মাওয়া প্রান্তে টোল প্লাজা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা থেকে সড়কপথে শিমুলিয়া ফেরিঘাটে যেতে এটি মাওয়া চৌরাস্তার কিছু উত্তরে চোখে পড়বে। টোল প্লাজা থেকে মাওয়া চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাগানো হয়েছে নতুন গাছ, যা শোভা বাড়িয়েছে পদ্মা সেতুর লৌহজং প্রান্তে। এ ছাড়া শুরু হয়েছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ। ইতিমধ্যে এ রাস্তার দুপাশের সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে মাটি ভরাটের কাজ। রাস্তার দুপাশে বালু ফেলে রাস্তাটি প্রশস্ত করা হচ্ছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে মাটি ফেলার কাজ। এই বর্ষার আগেই রাস্তার দুপাশের মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মাটি ভরাটের কাজ শেষ হলেই এটি চার লেনে উন্নীত করা হবে।

এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ দেখতে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটকই এখন সেতু এলাকায় আসছে। শুক্রবার বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূতসহ ১১ সদস্যের একটি দল দিনভর পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞ ঘুরে দেখে বিকেলে ঢাকায় ফিরে যায়। তারা কাজের অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে।


মন্তব্য