kalerkantho


চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেছেন, এই অর্জন হবে সম্মানের, মর্যাদার এবং গর্বের। তবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জর সামনে পড়তে হবে।

সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সংলাপ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বক্তাদের কথায় উঠে আসে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের ওপর বাড়তি প্রায় ৭ শতাংশ শুল্ক দেওয়ার সক্ষমতার প্রসঙ্গটিও। এতে পণ্য রপ্তানিতে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে এখন যেমন সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যায়, সেটিও বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় বাড়বে। অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধাও হারাবে বাংলাদেশ। এসব সুবিধা হারানোর আগে সরকারকে নানামুখী প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখন থেকে পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দিতে হবে। শুধু পোশাকশিল্পের ওপর ভর না করে ম্যানুফ্যাকচারিং, আইটিসহ অন্যান্য খাতের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা।

অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হতে চাইলে বাংলাদেশকে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এখন থেকেই। ২০২৭ সাল পর্যন্ত আমরা শুল্কমুক্তসহ অন্যান্য সুবিধা পাব। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে বাংলাদেশ বাজার সুবিধা হারাবে। আমরা শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। আর রপ্তানি বাড়াতে হবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের উৎপাদনশীলতাও কম। এটি বাড়াতে হবে। ’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। এ ছাড়া অবকাঠামো ও জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। অবশ্য এসব বিষয়ে সরকার কাজ করছে। সম্প্রতি বেসরকারীকরণ কমিশন ও বিনিয়োগ বোর্ডকে একীভূত করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে ব্যবসা সহজ করার জন্য। ’ এ সময় তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনসংখ্যার বোনাসকালকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। ব্যক্তিগত তিনজনকে আমি চিনি, যাঁরা ব্যবসা করতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ব্যবসা করতে গিয়ে এখানে অনেক আইন-বিধি ও বাস্তবায়নে সমস্যা আছে। ’ এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমস্যা তো রয়েছেই। এসব বিষয়ের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশসহ ৪৮টি দেশ এলডিসির তালিকায় রয়েছে। এ তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য জাতিসংঘের দেওয়া তিন শর্তের মধ্যে দুটি পূরণ করেছে বাংলাদেশ। একটি হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন, অন্যটি অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। অবশ্য আরেকটি সূচক মাথাপিছু জাতীয় আয়েও লক্ষ্য পূরণের পথে আছে বাংলাদেশ। তবে এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে ওষুধশিল্প ও আইটি খাত বড় প্রতিযোগিতায় পড়বে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধের ৯৭ শতাংশ কাঁচামাল দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। আর বাংলাদেশ এলডিসির তালিকায় হওয়ায় এসব কাঁচামাল বিনা শুল্কে আনতে পারে। ফলে বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদন ব্যয় এবং দাম বিশ্বের সবচেয়ে দেশের চেয়ে কম। কিন্তু এলডিসি থেকে বের হলে শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। ফলে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। একই অবস্থা সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও। ফলে এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে সরকারকে পরামর্শ দেন তিনি। তবে তিনি মনে করেন, ২০২৪ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে তাতে সফল হওয়া সম্ভব।

সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীদের আস্থা কমছে। এই আস্থা পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যাবে। এখানে গ্যাসের মারাত্মক সংকট। বিদেশিরা আমাদের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চায়। সরকার এলএনজি আমদানির কথা বলছে। কিন্তু কবে নাগাদ এলএনজি আমদানি হবে তার নিশ্চয়তা নেই। ’ তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের মজুদও কমছে। আগামী দিনে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠিত হলে গ্যাসের চাহিদা আরো বাড়বে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ব্যবসায়ীদের বড় সমস্যা সড়ক অবকাঠামোর নাজুক পরিস্থিতি। আর এ সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকেও কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তাতে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

‘স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ও চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামের সংলাপ সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।


মন্তব্য