kalerkantho


ফোরজি লাইসেন্স

চার বিষয়ে ফয়সালা চায় অপারেটররা

কাজী হাফিজ   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সরকার চলতি মাসেই মোবাইল ফোনের চতুর্থ প্রজন্ম বা ফোরজি সেবার লাইসেন্স দেওয়ার কথা জানালেও সে সম্ভাবনা ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অপারেটররাও প্রস্তুত নয়। এ সেবা দ্রুত চালুর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়ে অপারেটরদের দাবি, এ বিষয়ে সরকারকে আগে চার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এগুলো হচ্ছে—স্পেকট্রাম বা তরঙ্গের প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা দেওয়া, বাস্তবসম্মত মূল্যে আরো তরঙ্গ বরাদ্দ, ভবিষ্যৎমুখী কাঠামোর পক্ষে জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং শুল্ক প্রত্যাহার করে হ্যান্ডসেট সহজলভ্য করা।

অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এ লাইসেন্সের নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়া হতে পারে। আর এর নীতিমালা দ্রুত প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা জানান, এ মাসে ফোরজি লাইসেন্স দেওয়া অসম্ভব। কারণ নীতিমালাই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রযুক্তিগত সেবার মান নিশ্চিত করতে এবং গ্রাহকদের ভালো অভিজ্ঞতা দিতে আমরা প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা চাই। ’

রবির মুখপাত্র ইকরামুল কবীর বলেন, ফোরজি চালুর উদ্যোগকে আমরাও স্বাগত জানাই।

কারণ এরপর আমাদের ফাইভজিতে আসতে হবে। তবে ফোরজি চালুর আগে সব ধরনের স্পেকট্রামের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা দিতে হবে এবং এ সেবার জন্য গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় হ্যান্ডসেট যাতে সহজে পেতে পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে।

মোবাইল অপারেটরদের ধারণা, বিটিআরসি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আপাতত তাদের থ্রিজির জন্য বরাদ্দ ২১০০ মেগাহার্জ তরঙ্গ প্রযুক্তি নিরপেক্ষ করে ফোরজিতে ব্যবহারের অনুমতি দিতে চাইছে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় চতুর্থ প্রজন্মের সেবা শুরু করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাদের চাহিদা সব ধরনের তরঙ্গের ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা দিতে হবে। অর্থাৎ বরাদ্দ দেওয়া সব ধরনের তরঙ্গ সব সেবাতে ব্যবহারের অনুমতি চাচ্ছে তারা।

প্রসঙ্গত, বিটিআরসি ২০১২ সালে একই সঙ্গে থ্রিজি, ফোরজি ও এলটিই লাইসেন্সের জন্য নীতিমালা তৈরি করে। কিন্তু পরে শুধু থিজির জন্য লাইসেন্স এবং এ সেবার জন্য ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়। থ্রিজি লাইসেন্সের নীতিমালায় ২১০০ ব্যান্ডের তরঙ্গ সরকারের অনুমতি নিয়ে ফোরজিতে ব্যবহার করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নিলামে সরকারের হাতে থাকা আটটি ব্লকে ২১০০ ব্যান্ডের মোট ৪০ মেগাহার্জ তরঙ্গের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই পাঁচটি ব্লকের ২৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বিক্রি হয়। তার আগে সরকারি মালিকানার টেলিটককে দেওয়া হয় ১০ মেগাহার্জ তরঙ্গ। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের ওই নিলামে সর্বোচ্চ দুটি ব্লকের ১০ মেগাহার্জ তরঙ্গ কিনে নেয় গ্রামীণফোন। অন্য তিন অপারেটর—এয়ারটেল, রবি ও বাংলালিংক কেনে একটি করে ব্লকের মোট ১৫ মেগাহার্জ। এরপর ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের অবশিষ্ট ১৫ ও ১৮০০ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্জ তরঙ্গ নিলামের উদ্যোগ নিয়েও তা বিক্রি করতে পারেনি বিটিআরসি। ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল এ নিলামের কথা থাকলেও দেশের চার শীর্ষস্থানীয় অপারেটর কম্পানির প্রধান অংশীদারদের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, ২০০৩ সালে থ্রিজির জন্য ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামের সময় সিম প্রতিস্থাপন ও তরঙ্গের ভ্যাটসহ ট্যাক্স-সংক্রান্ত কিছু বিরোধ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে, এমন প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ওই নিলাম হয়েছিল। এ ছাড়া বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নীতিমালা হালনাগাদ, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ তরঙ্গ বরাদ্দসহ তরঙ্গের রোডম্যাপ প্রস্তুত এবং এসবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পথ সুগম করার কাজগুলো সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া নিলামের জন্য বিনিয়োগ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে জানা যায়, সিম প্রতিস্থাপনের ট্যাক্সের বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন। এ অবস্থায় তরঙ্গের প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা প্রদান ও জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালা প্রণয়ন হলে নিলামে অংশ নিতে সমস্যা নেই।

বিটিআরসির পরিকল্পনা রয়েছে ফোরজির জন্য ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামের। এ সম্পর্কে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ৭০০ মেগাহার্জ তরঙ্গ ব্যবহারের জন্য ইকোসিস্টেম এখনো প্রস্তুত নয়। বাজারও অপ্রস্তুত। এ ব্যান্ডের তরঙ্গের বিস্তার অনেক বেশি। ঢাকায় অপারেটরদের বর্তমান নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংগতি রেখে এ তরঙ্গ ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেবে। এ ধরনের তরঙ্গ গ্রাম এলাকার জন্য উপযুক্ত। কিন্তু ফোরজি আগে ঢাকাতেই চালু করতে হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোনের ২১০০, ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের মোট ৩২ মেগাহার্জ তরঙ্গ রয়েছে। এ তিন ব্যান্ডে বাংলালিংকের ২০, রবির ১৯ দশমিক ৯, এয়ারটেলের ২০ ও টেলিটকের ২৫ দশমিক ২ মেগাহার্জ তরঙ্গ রয়েছে। এদের মধ্যে এয়ারটেলের সঙ্গে  একীভূত হওয়ায় রবির তরঙ্গই সবচেয়ে বেশি।

২১০০ ব্যান্ডের তরঙ্গে ফোরজি চালুর ক্ষেত্রে সমস্যা সম্পর্কে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘এই ব্যান্ডের যে পরিমাণ তরঙ্গ আমরা বরাদ্দ পেয়েছি তা থ্রিজিতে ব্যবহার হচ্ছে। থ্রিজির গ্রাহক ও ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই মাঝে মধ্যে সংকট সৃষ্টি হয়।


মন্তব্য