kalerkantho


প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও উপেক্ষিত

বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ পাথর উত্তোলন

আরিফুর রহমান   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ পাথর উত্তোলন

বোমা মেশিন কিংবা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর তোলা যাবে না—এ নির্দেশ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ  হাসিনার। ২০০৯ সালের ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দিলেও সাত বছর পরও তা উপেক্ষিত।

এ পদ্ধতিতে পাথর তুলতে নিষেধাজ্ঞা আছে আদালতেরও। পাথর উত্তোলন গাইডলাইন, খনি ও খনিজসম্পদ বিধিমালায়ও যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় পাথর উত্তোলনকে বেআইনি ও অপরাধ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, আদালত ও সব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিলেট ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্থানে দেদার চলছে এ অবৈধ কাজ। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েও সফল হয়নি। এ পদ্ধতিতে পাথর তুলতে গিয়ে গত এক মাসে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোয়ারি থেকে পাথর তুলতে গিয়ে পুরো ভূমির শ্রেণি বদলে ফেলা হচ্ছে। পাথর উত্তোলন, বিপণন ও পরিবহনের কারণে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বোমা মেশিন ব্যবহারের ফলে অনেক স্থানে ফসলি জমি রূপ নিয়েছে জলাশয়ে। পাথর পরিবহনে ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে এলাকার রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ হুমকিতে পড়েছে। বাঁধে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাথর উত্তোলন কার্যক্রম লাল শ্রেণিভুক্ত। অথচ পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই এ কাজ করে যাচ্ছে সিলেট ও লালমনিরহাটের প্রভাবশালীরা। এ পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন।

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে কি করা উচিত জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান চালাই। স্থানীয় প্রশাসনও অভিযান পরিচালনা করে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার সেই একই অবস্থা। রাতের আঁধারেও পাথর তোলে ব্যবসায়ীরা। এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। ’ তাঁর মতে, ‘যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর তোলা চিরতরে বন্ধ করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে। এ ছাড়া কাজ হবে না। কারণ এর আগেও পাথর তোলা বন্ধ করার পর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে এ যুক্তিতে তা আবার শুরু করা হয়েছে। তাই এখন দরকার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ’

বিদ্যমান খনি ও খনিজসম্পদ বিধিমালায় বলা আছে, ভূমি থেকে পাঁচ মিটার বা ১৬.৪০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত কোয়ারিতে পাথর তোলা যাবে শুধু অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে। অযান্ত্রিকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, পরিবেশসম্মত যন্ত্রপাতি। যেমন—দা, কোদাল, শাবল, বেলচা ও খন্তা। পাঁচ মিটারের বেশি গভীরতা হলে সেটা আর কোয়ারি থাকে না। সেটা হয় খনি। খনি কিংবা কোয়ারি থেকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলা নিষিদ্ধ। কিন্তু মালিকরা এসব আইনকানুন পাত্তা না দিয়ে পাঁচ মিটারের বেশি গভীরতায় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর তুলছে। অবৈধভাবে পাথর তুলতে গিয়ে সিলেট ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্থানে গত এক মাসে অন্তত ১৫ শ্রমিক নিহত হয়েছে। সিলেটের গোয়াইনঘাট ও লালমনিরহাটের ডিমলায় ওই সব শ্রমিক মারা যায়।

পাথর তোলার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কি ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, সেটি দেখার জন্য সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধিদল নীলফামারী ও সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারি পরিদর্শন শেষে একটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়েছে, নীলফামারী কোয়ারিতে পাঁচ মিটারের জায়গায় অবৈধভাবে ২০ ফুটের বেশি গভীরতা থেকে পাথর তোলা হচ্ছে। ফলে এলাকাজুড়ে বিভিন্ন আকারের জলাশয় ও গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর তোলা হচ্ছে না। বোমা মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, নীলফামারীর ডিমলায় ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে পাথর তুলে তিস্তা নদীর মাঝখানে উঁচু বালির স্তূপ তৈরি করে রেখেছে। এতে নদীর পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে একসময় নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজের মারাত্মক ক্ষতি হবে বলে জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে পাথর তোলা, বিপণন ও পরিবহনের মাধ্যমে এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। জমির উত্পাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া ২০ ফুটের বেশি গভীরতা থেকে পাথর তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হবে। ভবিষ্যতে ওই সব এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, বাঁধ মেরামতে সরকারকে কয়েক গুণ বেশি খরচ করতে হবে। নীলফামারী ও সিলেটের কোয়ারি থেকে ভবিষ্যতে পাথর উত্তোলনে পরিবেশগত ছাড়পত্র না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।


মন্তব্য