kalerkantho


বিশ্ব পঙ্গু দিবস আজ

যে জীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল

তৌফিক মারুফ   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



যে জীবন অন্যের

ওপর নির্ভরশীল

‘আট বছর বয়সে বাপের হাত ধইর‍্যা রাস্তা পার অওনের সময় মোটরসাইকেলের নিচে পড়ছিলাম। হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রাণে বাঁচাইয়া রাহনের লইগ্যা কোমরের নিচ থিক্কা ডাক্তাররা কাইট্টা দিছে।

কিছুদিন পর একটা হাতও কাইট্যা হালাইতে অইছে। হেই থনে অইয়া গেলাম পঙ্গু। পড়াশোনা করতে পারি নাই, কাম-কাইজ করতে পারি না—এখন ভিক্ষা কইর‍্যা খাই; সংসার চালাই। ’

রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউর খেজুরবাগান এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ভিক্ষা করা ৩২ বছরের যুবক জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে নিজের পা ও হাত হারানোর এ কাহিনী শোনান। জাকির গত ২৪ বছর ধরে বয়ে চলছেন পঙ্গুত্বের যন্ত্রণাময় জীবন। জাকিরের মতো বহু প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ব্যবস্থার বাইরে। তাদের হয় নিজে নিজে কিছু করে না হয় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন চালাতে হয়।

দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার শিশু শারীরিক প্রতিবন্ধিত্ব বা পঙ্গুত্বের শিকার হয়; যাদের বড় অংশেরই এই অবস্থা সড়ক দুর্ঘটনায়। বাকিরা ভারী কিছুর আঘাতে বা কোথাও থেকে পড়ে গিয়ে পঙ্গু হচ্ছে।

তবে সব বয়সীর হিসাবে দেশে বছরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে চতুর্থ সমস্যা হয়ে উঠবে পঙ্গুত্ব। এমন অবস্থার মধ্য দিয়েই আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পঙ্গু দিবস।

বাংলাদেশ অর্থপেডিক সোসাইটির সভাপতি এবং জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)—নিটোরের অধ্যাপক ডা. আব্দুল গণি মোল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, এই হাসপাতালে প্রতিদিন যত রোগী আসে তাদের বড় একটি অংশেরই হাত বা পা একপর্যায়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হয় জীবন বাঁচানোর জন্য। আর এই লোকগুলো সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু এ দেশে তাদের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে তেমন পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, ‘একসময় মিরপুরে তিন একর জমি দেওয়া হয়েছিল অকুপেশনাল থেরাপি কার্যক্রমের জন্য। কিন্তু সেই জমি আর নিটোর পায়নি। ফলে প্রথমদিকে ভালো চিকিৎসা দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে আমরা তেমন কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। ’ তবে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন রকম কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডা. গণি মোল্লাহ রানা প্লাজার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘রানা প্লাজায় যারা পঙ্গু হয়েছে তাদের সারা জীবন ওই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে। ওই ঘটনায় যে কত মানুষের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ’

রানা প্লাজায় পঙ্গুত্ব : ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির শিকার হন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বাড়ই চেয়ারম্যানপাড়া এলাকার মেয়ে রেবেকা। সম্প্রতি রেবেকা বলেন, ‘দুই পা না থাকা যে কী কষ্টের তা অন্যরা বুঝবে না। মাঝেমধ্যেই মনে হয় এর চেয়ে মরণও ভালোই আছিল। ’ রানা প্লাজার ঘটনায় এ রকম বহু রেবেকাই আজ পঙ্গু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রানা প্লাজার ঘটনায় জীবিত উদ্ধার পাওয়া দুই হাজার ৪৩৯ জনের মধ্যে এক হাজার ৮৮৫ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ ছাড়া ৮২৯ জনের অবস্থা গুরুতর থাকায় তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১৪ জন। বাকিদের দরকার হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার। ঘটনার পর ১৬টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ট্রমা সেন্টার অকার্যকর : দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কের কাছাকাছি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসার জন্য অন্যান্য হাসপাতালের পাশাপাশি ট্রমা সেন্টার নামে বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করা হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমে পাঁচটি ট্রমা সেন্টার চালু থাকলেও বাস্তবে এগুলো অকার্যকর হয়ে আছে। কোনোটির যন্ত্রপাতি অচল আবার কোনোটিতে নেই পর্যাপ্ত জনবল।

বাংলাদেশ অর্থপেডিক সোসাইটির সভাপতি বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেও যদি কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গসহ চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয় তবে অনেককেই ওই অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। ট্রমা সেন্টারগুলো এ ক্ষেত্রে ভালো একটি উদ্যোগ ছিল। কিন্তু বাস্তবে এগুলো তেমন কার্যকর না হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।


মন্তব্য