kalerkantho


নোংরা ও দুর্গন্ধে শহরে টেকা দায়

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নোংরা ও দুর্গন্ধে শহরে

টেকা দায়

ময়মনসিংহ শহরের বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত সি কে ঘোষ রোড। এই রোডের প্রেস ক্লাবের সামনের অংশ থেকে দক্ষিণ দিকে ছায়াবাণী সিনেমা হল পর্যন্ত ডানে-বামের অন্তত ১০ জায়গায় ময়লার স্তূপ।

দুর্গাবাড়ী সড়কের দুই পাশেও চোখে পড়বে একই দৃশ্য। শহরের অধিকাংশ পাড়া-মহল্লা ও পথঘাটের অবস্থা একই।

সরেজমিনে শহরের চরপাড়া, পণ্ডিতবাড়ী, পণ্ডিতপাড়া, আমলাপাড়া, হরিকিশোর রায় রোড, ধোপাখলা মোড়, সেহড়া, হিন্দুপল্লী, কবরখানা, মহারাজা রোড, পুরোহিতপাড়া, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডের মোড়, আর কে মিশন রোড, নওমহল বাইলেন প্রভৃতি এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে। কাক, কুকুর, বিড়াল সেই ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আশপাশে উত্কট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ইশতিয়াক হোসেন নামের এক বাসিন্দা বলেন, তাঁর মেয়ে পড়ে গঙ্গাদাশ গুহ সড়কের একটি স্কুলে। স্কুল ছুটির আগে তিনিসহ অনেক অভিভাবককেই স্কুলের সামনে অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ সইতে হয়। এমনকি শিশুদের নিয়ে ছড়িয়ে থাকা ময়লার ওপর দিয়ে হেঁটে সড়কের ওই অংশ পার হতে হয়।

পিয়নপাড়া এলাকার বাসিন্দা কাইয়ুম হাসান বলেন, তাঁদের সড়কের কোথাও কোথাও এত ময়লা ছিটানো থাকে যে রাস্তাই দেখা যায় না। ময়লা মাড়িয়েই তাঁদের চলাফেরা করতে হয়।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এই শহরে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ টনের মতো ময়লা জমে। কিন্তু প্রতিদিন অপসারণ করা সম্ভব হয় ১০০ টনের মতো। বাকি ময়লা সড়কে কিংবা ডাস্টবিনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এবং স্তূপাকার পড়ে থাকে। যানবাহন স্বল্পতায় চক্রাকার পদ্ধতিতে বিভিন্ন সড়কের ময়লা অপসারণ করা হয়।

পৌরসভা সূত্র আরো জানায়, ময়লা অপসারণে বর্তমানে পৌরসভায় মোট ১৪টি ট্রাক রয়েছে। কিন্তু দুটি ট্রাক অনেক দিন ধরেই নষ্ট। এ ছাড়া গড়ে প্রতিদিনই দুই-তিনটি ট্রাক নষ্ট থাকে। সচল যে ট্রাকগুলো থাকে তার অন্তত দুটি সারা দিনই ব্যস্ত থাকে প্রধান সড়কসহ শহরের মেছুয়াবাজার এবং চরপাড়া ও হাসপাতাল রোড পরিচ্ছন্ন করার কাজে। বাকি ট্রাকগুলো দিয়ে শহরের অর্ধেক এলাকাও ভালোভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হয় না।

পৌরসভা সূত্রেই জানা গেছে, শহরের ২১টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডে পাড়া-মহল্লা ও অলিগলি পরিচ্ছন্নতার জন্য রয়েছে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন করে পরিচ্ছন্নতা কর্মী। এদের দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের। বর্তমানের জনবহুল ওয়ার্ডগুলোর জন্য পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের এ সংখ্যাও খুবই অপ্রতুল। এদের বেতনও নামমাত্র। মাসিক মাত্র চার হাজার ২০০ টাকা। এসব শ্রমিকের অনেকেই আবার নিয়মিত কাজ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সংখ্যার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দিয়ে নিয়মিত কাজ না করানোর ক্ষেত্রে অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

এ ছাড়া পয়োনিষ্কাশন নালা থেকে তুলে আনা ময়লা ও মাটিও নিয়মিত ও দ্রুত অপসারণে তত্পর নয় পৌরসভা। এ কারণে অনেক স্থানের ড্রেনের মাটি দিনের পর দিন শুকিয়ে ধুলায় রূপ নিয়ে এলাকায় নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ময়মনসিংহ শহর নোংরা হওয়ার পেছনে পৌরসভার ব্যর্থতা যেমন আছে, তেমনি নাগরিকরাও তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। অধিকাংশ নাগরিকই যথাস্থানে ময়লা ফেলে না। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনা পলিথিনে মুড়িয়ে ড্রেনের ভেতর ফেলে ড্রেনগুলো অকার্যকরও করছে অনেক বাসিন্দা।

নোংরা হওয়ার কারণে ময়মনসিংহ শহর জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. খলিলুর রহমান বলেন, ময়লা-আবর্জনা এবং নোংরা পরিবেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়ে। যেমন—আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েড এবং কৃমির সমস্যা ও শ্বাসকষ্ট। ডা. খলিলুর রহমান বলেন, অনেক সময় মানুষ নিজে পরিষ্কার ও সচেতন হলেও আশপাশের পরিবেশের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।

শহরের নোংরা পরিবেশ ও আবর্জনার সমস্যা নিয়ে পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর দীপক মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, এ শহরে প্রতিদিন যে পরিমাণ ময়লা জমে, তার ৮০ ভাগ তাঁরা অপসারণ করতে পারেন। যানবাহন ও শ্রমিক স্বল্পতার কারণেই এমন অবস্থা বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, নতুন আরো অন্তত পাঁচটি ট্রাক যদি ময়লা অপসারণের জন্য পাওয়া যেত, তাহলে তারা পরিচ্ছন্ন শহর উপহার দিতে পারতেন।


মন্তব্য