kalerkantho


লালন স্মরণোৎসব

সাধন ভজনে মগ্ন ছেঁউড়িয়া

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



একতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া। আগত বাউলশিল্পীরা খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে গেয়ে চলেছেন লালনের সব আধ্যাত্মিক গান। সুর মেলাচ্ছে দর্শনার্থীরাও। হাজার হাজার লালনভক্তের পদচারণ আর সাধন-ভজনে গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে লালনের সাধনভূমি।

তিন দিনব্যাপী লালন উৎসব ও বাউল মেলার গতকাল রবিবার ছিল দ্বিতীয় দিন। স্থানীয় লালন একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করেছে। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হান।

আয়োজকরা জানান, উৎসবে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাঁইজির ধামে ছুটে এসেছেন অসংখ্য বাউল, ভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থী। উৎসব নির্বিঘ্ন

করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

লালন একাডেমির কর্মকর্তারা জানান, রীতি অনুসারে দোল পূর্ণিমার রাতের আগে শনিবার বিকেলে অধিবাস গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দোলসঙ্গ।

পরদিন গতকাল সকালে বাল্যসেবা গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত হয় গোষ্ঠ গান। দুপুরে পুণ্যসেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ করে আখড়াবাড়ি ত্যাগ করেন বেশির ভাগ সাধু-বাউল। তবে আলোচনা ও গানের জন্য অনেক ভক্ত সাঁইজির ধামে থেকে যান আরো এক দিন।

প্রতিবছরের মতো এবারও আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব শুরুর আগে থেকেই ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে ছুটে এসেছে লাখো মানুষ। আখড়াবাড়ি ও সামনের বিশাল মাঠ এখন ভক্ত-অনুসারী, সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীর পদভারে মুখর। তাই কালীগঙ্গা নদীর তীরে মিলিত হয়ে ভক্ত-অনুসারী ও সাধু-বাউলরা মেতে আছেন সাধন-ভজনে। আর গুরু-শিষ্যরা সাঁইজির গানের মাঝে খুঁজে ফিরছেন তাঁদের আত্মার আত্মীয়কে। গুরু-শিষ্যের মিলনমেলার এ উৎসব চলবে আজ সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত। তিন দিনের এ উৎসবে লালনের কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা ছাড়াও রাতভর লালন মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করছেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীসহ লালন একাডেমির শিল্পীরা।

লালন মাজারের প্রধান খাদেম ফকির মহম্মদ আলী শাহ জানান, সত্য ও সুপথের সন্ধানে মানবতার দীক্ষা নিতে আত্মার টানে দেশ-বিদেশের সাধুগুরু ও ভক্তরা দলে দলে এসে আসন গেড়েছে সাঁইজির মাজারে।

ফরিদপুর থেকে আসা লালনভক্ত কেয়া মজুমদার বলেন, ‘লালনের জাতহীন মানবধর্ম, তাঁর জীবনকর্ম ও ধর্ম-দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে ছুটে এসেছি। ’ ভারতের পশ্চিম বাংলার বারাসাত থেকে আসা রূপন্তী পুরকায়স্থ বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে আসি লালনের দীক্ষা নিতে। এভাবে আমৃত্যু এখানে আসব। ’

কুষ্টিয়ার সহকারী পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদিন জানান, সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে র‍্যাব ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশের পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের পাশাপাশি আখড়াবাড়ির সব কটি প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর ও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

বাউল সাধক ফকির লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার রাতে সাধু-ভক্তদের নিয়ে এই উৎসব পালন করতেন।


মন্তব্য