kalerkantho


সুন্দরবন এলাকায় ডোবা জাহাজ তিন মাসেও ওঠেনি

চর জেগে হুমকিতে পড়তে পারে গোটা চ্যানেল

আরিফুর রহমান   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চর জেগে হুমকিতে পড়তে

পারে গোটা চ্যানেল

এ বছরের ১৩ জানুয়ারি সকাল ১০টা। যশোরের উদ্দেশে রওনা হওয়া এক হাজার মেট্রিক টন কয়লাবাহী জাহাজ ‘এমভি আইজগাতি’ সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এসে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার প্রায় তিন মাস হতে চলেছে, এখনো জাহাজটি ওঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেনি ওই জাহাজ কর্তৃপক্ষ। ডুবন্ত জাহাজ খুব দ্রুত ওঠাতে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। তবে শেষবারের মতো জাহাজের মালিক কাজী ফারুক আহমেদকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামীকালের (১৪ মার্চ) মধ্যে ডুবন্ত জাহাজ উত্তোলন কিংবা অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে জাহাজ তোলার প্রক্রিয়া শুরু না করলে কিংবা ব্যর্থ হলে বন্দরের নিজস্ব আইনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে জাহাজ মালিককে।

এত দিন পেরিয়ে গেলেও সুন্দরবন এলাকায় ডুবে যাওয়া জাহাজ এমভি আইজগাতি তুলতে না পারায় সমালোচনা করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এতেই প্রমাণিত হয়, এ ধরনের জাহাজ তোলার সক্ষমতা এখনো হয়নি। যে চ্যানেলে জাহাজটি ডুবেছে, জাহাজের সঙ্গে বালু বাঁধা পেতে পেতে এক সময় আশপাশে চর জেগে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে করে চ্যানেলটি নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ ওই চ্যানেল দিয়ে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা আমদানির কথা রয়েছে।

চর পড়লে ভবিষ্যতে হুমকিতে পড়তে পারে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা আমদানির কাজ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে চ্যানেলে এমভি আইজগাতি ডুবেছে, সে চ্যানেল দিয়ে বছরে ৮০০টি জাহাজ কয়লা নিয়ে চলাচল করবে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য। একটি জাহাজ তুলতে এত সময় লাগলে ভবিষ্যতে যদি কোনো কারণে আরেকটি জাহাজ ডুবে যায় তাহলে অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে। ’

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, গত ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে বয়া এলাকায় অবস্থানরত মাদার ভ্যাসেল থেকে এক হাজার টন কয়লা বোঝাই করে এমভি আইজগাতি জাহাজ হিরণ পয়েন্ট দিয়ে যশোরের দিকে যাচ্ছিল। হিরণ পয়েন্ট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছালে কয়লাবাহী জাহাজটি ডুবে যায়। পরে জিপিএসের মাধ্যমে ডুবে যাওয়া জাহাজটির অবস্থানও নির্ণয় করা হয়। জাহাজের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে জাহাজটি উত্তোলনের জন্য ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয় মালিকপক্ষকে। এরপর আরো দুইবার জাহাজের মালিক কাজী ফারুক আহমদকে তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো তাগাদাতেই কাজ হয়নি। মালিকপক্ষের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

শেষবারের মতো জাহাজের মালিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে, আগামী ১৪ মার্চের মধ্যে জাহাজ তুলতে। জাহাজটি তোলার সময় বেশ কয়েকটি শর্ত প্রতিপালন করতে বলেছে বন্দর কৃর্তপক্ষ। জাহাজের মালিকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, স্যালভেজ চলাকালে দুর্ঘটনা এলাকায় স্বাভাবিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো বিঘ্ন ঘটানো যাবে না। স্যালভেজ কাজে কোনো ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না। এ সময় পরিবেশ দূষণ, দুর্ঘটনা বা ক্ষয়ক্ষতি হলে দায়ী থাকবে মালিকপক্ষ।

১৪ মার্চের মধ্যে জাহাজ তুলতে না পারলে বন্দর সচল রাখার স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্য রিমোভাল অব রিক অ্যান্ড অবাস্ট্রাকশন ইন ইনল্যান্ড নেভিজেবল ওয়াটারওয়ে রুলস ১৯৭৩’-এর ধারা ১১ মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সে পদক্ষেপ কী হতে পারে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিধিতে বলা আছে, চ্যানেল সচল রাখার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার মনে করে তাই করবে। সে ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব উদ্যোগে জাহাজটি তোলার ব্যবস্থা করবে। তোলার পর মালিকপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হবে। অথবা জাহাজ বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।

জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার অলিউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জাহাজের মালিককে শেষবারের মতো চিঠি দিয়েছি জাহাজটি তোলার জন্য। তারা জাহাজ না ওঠালে আমরা আমাদের আইনের আলোকে ব্যবস্থা নেব। ’ ডুবন্ত জাহাজের কারণে কী সমস্যা হচ্ছে জানতে চাইলে কমান্ডার অলিউল্লাহ বলেন, নৌ চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে জাহাজটি বেশি দিন পানির নিচে থাকলে সেখানে চর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে করে চ্যানেল নষ্ট হবে।

অলিউল্লাহ বলেন, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ দেশে বড় একটি স্যালভেজ জাহাজ আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাহাজের মালিক কাজী ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম থেকে স্যালভেজ জাহাজ এনে শিগগিরই জাহাজ তোলার ব্যবস্থা করবেন। এত দিন কেন শুরু করেননি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্যালভেজ জাহাজ পাওয়া যায়নি। তাই উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়নি।

কয়লাবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার কারণে সুন্দরবন এলাকায় কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি জলজ প্রাণী ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। তিনি বলেন, সেখানে যে কয়লা পড়েছে, তা ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। এগুলো নিম্নমানের কয়লা। আর কয়লার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ থাকে। এতে করে ওই এলাকার জলজ প্রাণী যেগুলো আছে, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিতে পড়বে। ডুবন্ত এমভি আইজগাতির কারণে ওই এলাকায় ধীরে ধীরে চর জাগা শুরু হবে। জোয়ারের সময় একবার আবার ভাটার সময় একবার জাহাজের সঙ্গে বালি বাধা পেতে পেতে এক সময় আশপাশের এলাকায় প্রচুর বালি জমে গিয়ে চর উঠবে। তখন পুরো চ্যানেল নাব্যতা হারাবে। আর চ্যানেল যদি নাব্যতা হারায়, তাহলে রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা নেওয়া বাধাগ্রস্ত হবে।


মন্তব্য