kalerkantho


র‍্যাব-বায়রা যৌথ সেমিনার

বিদেশে যাওয়ার আগে দক্ষ ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘ভিটেমাটি বিক্রি করে দালালকে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলাম। দালাল চট্টগ্রাম থেকে দুবাই দিয়ে সিরিয়ায় নিয়ে যায়।

সেখানে আমাকে একজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। ভোর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। মালিক প্রায়ই চাবুক দিয়ে পেটাত। যৌন নির্যাতন করত। একপর্যায়ে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে কান্নাকাটি করলে আবার আগের মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হয় আমাকে। এরপর চলে দ্বিগুণ নির্যাতন। একদিন ইন্দোনেশীয় এক নারীর মাধ্যমে মায়ের কাছে ফোন করি। মা বিষয়টি র‍্যাবকে জানায়, র‍্যাব আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে। ’ মর্মস্পর্শী এ বর্ণনা সিরিয়া থেকে ফেরা পটুয়াখালীর এক নারীর। দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘নিরাপদ অভিবাসন এবং মানবপাচার প্রতিরোধ’ শীর্ষক সেমিনারে দুর্ভোগের এ চিত্র তুলে ধরে ওই নারী বলেন, ‘এখন আমি কী করব? স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন। ছোট দুটো বাচ্চা, চলব কিভাবে?’

র‍্যাব ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুট এজেন্সিজ (বায়রা) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘ইস্তাম্বুলে গিয়ে দেখি, ৮০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছে। তারা লাখ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে ভাগ্য অন্বেষণে ইউরোপে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তুরস্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটক করে। তবে তারা দেশেও ফিরতে চায় না। জেল থেকে মুক্তি পেলে যেকোনোভাবে ইউরোপে যেতে চায়। সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ এভাবে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়ছে। তাই সবাই মিলে মানবপাচারকারীদের রুখতে হবে। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অবৈধ এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে অনেকে কারাবন্দি হওয়ার পাশাপাশি নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। র‍্যাব মানবিক কারণে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

পাচারের শিকার হয়ে বিদেশে যাওয়ার পর র‍্যাবের মাধ্যমে ফিরে আসা ওই নারীসহ ১০ ভুক্তভোগীকে সেমিনারে এক লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। ফিরে আসা এসব মানুষ বিদেশে তাদের ওপর চরম নির্যাতনের কথা তুলে ধরে।  

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাঁরা বিদেশে যাবেন, তাঁদের দক্ষ হয়ে যেতে হবে। সরকার এ জন্য নতুন করে আরো ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করছে। প্রবাসীদের কল্যাণেও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তা ছাড়া নিবন্ধিত এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গেলে কোনো ধরনের সমস্যা হয় বলে আমার জানা নেই। কেউ দেশের বাইরে কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লে মন্ত্রণালয় তার সুরাহা করবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কথা বলে তার চাকরির ব্যবস্থা করবে। ’

র‍্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, পাচারের শিকার মানুষ বিদেশে নির্যাতন এমনকি মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। অন্যের জীবন হুমকিতে ঠেলে দেওয়ায় একজন পাচারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ১২ বছরের কারাদণ্ড। এ ক্ষেত্রে মানবপাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার কমে আসবে।

সচেতনতার অভাব মানবপাচারের মূল কারণ উল্লেখ করে বেনজীর আহমেদ বলেন, যতগুলো মানবপাচারের ঘটনা ঘটেছে তার সবই হয়েছে অনিবন্ধিত ভুঁঁইফোড় এজেন্সির মাধ্যমে। এসব এজেন্সির বিষয়ে জনগণকে সচেতন হতে হবে। ব্যাপক জনসচেতনতার মাধ্যমে মানবপাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব বেগম সামসুন্নাহার বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রাইভেট সেক্টরের কারণে নিবন্ধন করেও লোক পাঠানো যায়নি। সরকারের মাধ্যমে যে সাত হাজার লোক বিদেশে গেছে তারা ন্যূনতম টাকা দিয়েই প্রবাসে যেতে পেরেছে। র‍্যাবের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে কাজ করা হবে বলেও তিনি জানান।

বায়রার সাবেক সভাপতি নুর আলী বলেন, মালয়েশিয়ায় গত ৯ বছরে লোক পাঠানো যায়নি। প্রতি বছর তিন লাখ করে লোক পাঠালেও ২৭ লাখ লোক মালয়েশিয়ায় পাঠানো যেত। এতে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া লোকের পরিমাণ কমত।


মন্তব্য