kalerkantho


শ্রীপুরের তেলিহাটী উচ্চ বিদ্যালয়

বেতন-ভাতা মোমতাজের উত্তোলন করেন জসীম!

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট ওর্ডার) নৈশ প্রহরী মোমতাজ উদ্দিন। কিন্তু প্রতি মাসে ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা তোলেন জসীম উদ্দিন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে নজিরবিহীন এ দুর্নীতি চলছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটী গ্রামের তেলিহাটী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ঘটনাটি ধরা পড়লেও প্রতিবারই ‘রহস্যজনক’ কারণে চুপ থেকেছে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদসহ প্রধান শিক্ষকরা। অবশেষে টের পেয়ে মোমতাজ উদ্দিনের ছেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ করেছেন।

মোমতাজ উদ্দিন (৬০) পাশের গোদারচালা গ্রামের মৃত মইজউদ্দিনের ছেলে। জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা জসীম উদ্দিন (৫৮) পাশের উদয়খালী গ্রামের মৃত আবদুল কাদির প্রামাণিকের ছেলে।

মোমতাজ উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর তিনি নৈশ প্রহরী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। প্রায় দুই বছর চাকরি করার পর তখনকার প্রধান শিক্ষক মৃত মোহব্বত আলী তাঁকে বিদ্যালয়ে যেতে নিষেধ করেন। এর পর থেকে তিনি আর বিদ্যালয়মুখী হননি।

ওই বিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, চাকরিতে যোগদান না করলেও ১৯৮২ সালে এমপিওভুক্ত হন মোমতাজ উদ্দিন। তাঁর সূচক (ইনডেক্স) নম্বর ৭২৯৯০৩। মোমতাজ উদ্দিনের জন্মতারিখ ১৯৫৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। চলতি বছরই চাকরির পূর্ণ মেয়াদ শেষ হয়েছে তাঁর।

মোমতাজ উদ্দিন আরো জানান, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর নিত্য অভাবের সংসার। টাকার অভাবে ছেলেমেয়েকে তিনি তেমন পড়ালেখাও করাতে পারেননি। পাশের বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর খরচ জোগাতে না পারায় ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েরও পড়ালেখা হয়নি। দিনমজুরি করে দুই বেলার অন্ন জুটিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি পাশের ছাতিরবাজার এলাকায় ডিবিএল কারখানার সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন।

এ প্রতিবেদক কথা বললে মোমতাজ উদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘মোহব্বত স্যার হেই দিন আমারে স্কুলতে বাইর না কইরা দিলে আমার জীবনডা এমন অই তো না। পোলাপানরে লেহাপড়া করাইয়া অনেক বড় করতে পারতাম। ’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার নামে আওয়া (আসা) টেহা খায়া সুখ করে জসীম। ’

মোমতাজ উদ্দিনের একমাত্র ছেলে কবির হোসেন অভিযোগ করেন, ‘এমপিওভুক্ত নৈশ প্রহরী তাঁর বাবা। কিন্তু জালিয়াতি করে বিদ্যালয়ের তখনকার পরিচালনা পর্ষদসহ প্রধান শিক্ষক জসীম উদ্দিনকে মোমতাজ উদ্দিন সাজিয়ে নৈশ প্রহরী হিসেবে যোগদান করায়। যোগদানের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মোমতাজ উদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে বেতন-ভাতা তুলছে জসীম। ’

জালিয়াতির ব্যাপারে বক্তব্য জানতে অনেকবার ফোন করা হলেও অভিযুক্ত জসীম উদ্দিন ফোন ধরেননি। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী মুনসুর মানিক দাবি করেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী জসিম। তাঁকে আমি মোমতাজ উদ্দিন জসীম হিসেবে জানি। মোমতাজ উদ্দিন নামে অন্য কোনো ব্যক্তি রয়েছেন কি না, আমার জানা ছিল না। ইউএনও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে ঘটনাটি জানতে পেরেছি। তদন্ত ছাড়া এখন কিছুই বলতে পারব না। ’

উল্লেখ্য, মোমতাজ উদ্দিনের নাম এমপিওভুক্ত হওয়ার পর অন্য কাউকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাশের একটি বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক জানান, পরিচালনা পর্ষদসহ প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতা না থাকলে এ জালিয়াতি সম্ভব নয়। জসীম চাকরি করেন। নিয়ম মতে তাঁর বেতন-ভাতা পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু তিনি যা করছেন, তা জালিয়াতি। এমন জালিয়াতির কঠিন শাস্তিও দাবি করেন তিনি।

বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, তেলিহাটী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন সরকার বলেন, ‘আমি ঘটনাটির কিছুই জানি না। কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহেনা আক্তার বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত চলছে। ’


মন্তব্য