kalerkantho


মান্নান স্যারের ‘প্রত্নদুনিয়া’ জাদুঘরে

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মান্নান স্যারের ‘প্রত্নদুনিয়া’ জাদুঘরে

বগুড়ার মহাস্থান জাদুঘর চত্বরে গতকাল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেনের কাছে বিপুল পরিমাণ প্রত্নসামগ্রী হস্তান্তর করেন আব্দুল মান্নান। ছবি : কালের কণ্ঠ

টানা ৪২ বছর ধরে মাঠঘাট আর গ্রামগঞ্জে ঘুরে সংগ্রহ করা প্রত্নসামগ্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর করলেন বগুড়ার প্রত্নবস্তু সংগ্রাহক অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। গতকাল শনিবার বিকেলে বগুড়ার মহাস্থান জাদুঘর চত্বরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেনের কাছে বিপুল পরিমাণ প্রত্নসামগ্রী হস্তান্তর করেন আব্দুল মান্নান।

এর আগে বিগত ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর ‘মান্নান স্যারের প্রত্নদুনিয়া’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয় কিভাবে তিনি গ্রামগঞ্জে ঘুরে এ অসাধ্য সাধন করেছেন।

ধ্যাপক মান্নান বলেন, সেই ছেলেবেলায় মা-বাবার কাছে গল্প শোনার বায়না ধরতেন তিনি। রাজ-রাজড়াদের গল্প বলতেন তাঁরা। সে গল্প তাঁদেরই এলাকার প্রাচীন কাহিনী। চার হাজার বছরের ইতিহাস শুনে কখনো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতেন তিনি। কখনো আতঙ্কে চোখ ছানাবড়া। প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর (এখন মহাস্থানগড়) প্রতি ভালোবাসার এভাবেই শুরু। নানাজনের কাছে এসব কাহিনী শোনেন, মনের খাতায় জমা করেন।

দিন দিন ইতিহাসের ভাণ্ডার বড় হলো, বেড়ে উঠতে লাগলেন আব্দুল মান্নান। সেদিনের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি। আজ সেগুলো সরকারের কাছে হস্তান্তর করলেন।

মহাস্থানগড় তথা পুণ্ড্র নগরীর কোলঘেঁষা গ্রামে বেড়ে ওঠা আব্দুল মান্নান শৈশব থেকেই আগ্রহী ছিলেন পুরাকীর্তি ও প্রত্নসামগ্রীর প্রতি। জন্মস্থানটি ঐতিহাসিক পুন্ড্র নগরীতে হওয়ায় তাঁর সেই ভালোবাসা আরো শক্ত হয় শিক্ষাজীবন থেকে। একসময় তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি ইতিহাস গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করেন। ‘ইতিকথা পুণ্ড্রবর্ধন’ নামে সেই ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে চষে বেড়ান পুরো মহাস্থান ও এর আশপাশের এলাকা। সেই সময় তাঁর নজরে আসে অনেক প্রত্নসামগ্রী নানা স্থানে নানাজনের কাছে অনাদরে পড়ে আছে। তিনি সেই গ্রন্থের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি অনাদরে পড়ে থাকা প্রত্নবস্তুও সংগ্রহ শুরু করেন।

সেই যে ১৯৭৫ সালে তাঁর সংগ্রহ শুরু হয়, টানা ৪২ বছর ধরে তিনি সেসব সংগ্রহ করে নিজ হেফাজতে রাখেন। পুঁতির দানা থেকে প্রাচীন আমলের পণ্যবিনিময়ে ব্যবহৃত কড়ি, মৃৎসামগ্রী থেকে শুরু করে তামা, পিতল ও ব্রোঞ্জের তৈজসপত্র; খাট-পালঙ্ক, দরজা-কপাট এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। একসময় তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে একটি জাদুঘর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সেই অনুমোদন সম্ভব নয় বলে তাঁকে জানানো হলে তিনি সংগৃহীত সামগ্রী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন বগুড়ায় এসে ওই সামগ্রীগুলো তাঁর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন।

হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা, মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মজিবর রহমান প্রমুখ।

যেসব সামগ্রী হস্তান্তর করলেন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান : শনিবার দুই হাজার ৬০০-এর অধিক প্রত্নসামগ্রী তিনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, পোড়ামাটির ঢাকনা, ঢাকনাসহ পাতিল ও বাটি, লাল ও কালো রঙের কলসি, ব্রোঞ্জের বাটি, খাড়ুয়া, বালা, লকেট, গলার হার, চুলের কাঁটা, কোমরের বিছা, চিনামাটির থালা, আলাদিনের প্রদীপসদৃশ পাত্র, মসলা বাটার লোহার পাত্র, অলংকার সংরক্ষণের জন্য ছোট বাক্স, কাচের মূর্তি, পাখির প্রতিকৃতির মূর্তি, হুঁকা, ছোট হাস্যবদন বুদ্ধমূর্তি, সাদা পাথরের বটিকা, পিতলের বাটি, থালা ও কুপি, ঘটি, জলদানি, পোড়ামাটির নলযুক্ত কলস, পিতলের রিকশা, পানদানি, আতরদানি, সুরমাদানি, রুপার মুদ্রা, তামার মুদ্রা, কড়ির মালা, হাড়ের তৈরি নরমুণ্ড মালা, কাঠের মালা, সোনার প্রলেপযুক্ত কয়েন, তামার ফরসিলিপি, পোড়ামাটির সিলিং (মোহর), নানা রঙের বিটিং (পুঁতি), প্রাচীন আমলের দরজা (কপাট) ও খাট (পালঙ্ক) উল্লেখযোগ্য।

অধ্যাপক আব্দুল মান্নান জানান, প্রত্নবস্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি এসব সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলেন। ইচ্ছা ছিল মানুষের জন্য এগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন, যেন মানুষের মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। সেই ইচ্ছা থেকেই তিনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সেসব হস্তান্তর করলেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মহাস্থান জাদুঘরে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয়াব্দ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত নানা সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সংগৃহীত বেশির ভাগ সামগ্রীই অত্যন্ত মূল্যবান এবং ইতিহাসের অংশ। এ কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সেসব জনগণের মধ্যে প্রদর্শনের জন্য সরকারের কাছে জমা দিতে সম্মত হন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিজে উপস্থিত থেকে সেসব সামগ্রী গ্রহণ করেছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বলেন, মহাস্থান তথা প্রাচীন এই পুণ্ড্র নগরী অত্যন্ত সমৃদ্ধ এলাকা। এ অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ব্যক্তি উদ্যোগে যেসব সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন, তা সময়সাপেক্ষ বিষয়। ওই সব সামগ্রী তিনি সরকারকে হস্তান্তর করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কাছ থেকে ওই সামগ্রীগুলো গ্রহণের পর মহাস্থান জাদুঘরে তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি সামগ্রীর নিচে তাঁর সৌজন্যে পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হবে।


মন্তব্য