kalerkantho


রাগীব আলীর চালিয়াতি

ব্যাংকের দায় মিটিয়েও গুলশানের বাড়ি ফেরত পাচ্ছে না ওয়ারিশরা

আপেল মাহমুদ   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ব্যাংকের দায় মিটিয়েও গুলশানের বাড়ি ফেরত পাচ্ছে না ওয়ারিশরা

রাগীব আলী

বিতর্কিত ব্যবসায়ী রাগীব আলী জালিয়াতি করে রাজধানীর গুলশানের একটি বাড়ি দখল করেছিলেন। সর্বোচ্চ আদালতে বিষয়টি প্রমাণিতও হয়।

অবশ্য এর আগেই তিনি তথ্য গোপন করে সেটি ৭০ কোটি টাকায় ঢাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বাড়িটি বন্ধক রাখা ছিল। প্রকৃত মালিকরা সুদে-আসলে সব টাকা ব্যাংককে ফেরত দেওয়ার পরও এর দখল পাচ্ছে না।

বাড়ির প্রকৃত ওয়ারিশদের মতে, ব্যাংকে বন্ধক রাখা জমি জাল দলিলের মাধ্যমে দখলে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। অথচ রাগীব আলী তা-ই করেছেন এবং ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের অভিমত, রাগীব আলীর মালিকানা সঠিক নয়। সংগত কারণেই তাঁর কাছ থেকে যিনি বাড়িটি কিনেছেন তাঁর মালিকানাও বৈধ নয়। এর পরও সেই অবৈধ মালিক সশস্ত্র আনসার নিয়োগ করে ১৫০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়িটি দখল করে রেখেছেন।

বাড়িটির অন্যতম ওয়ারিশ সামসুল আরেফিন খান বলেন, ‘আমাদের এ আর এ জুট ট্রেডিং কম্পানির প্রয়োজনে আমার বাবা আনোয়ারুল আজিম খান গুলশানের ২২ কাঠা ২ ছটাক জমির ওপর বাড়ি এবং আরো কিছু সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিলেন।

২০১৫ সালে তিনি মারা যান। ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল। কম্পানিটি খেলাপির তালিকাভুক্ত হয়। একপর্যায়ে ঋণ বেড়ে ৫৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৫ সালে আদালতের রায়ে আমরা ৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা রেয়াত পাই। বাকি ১৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে বলেন আদালত। এরপর আমরা ব্যাংককে সব টাকা পরিশোধ করি। কিন্তু এখনো বাড়ি ফিরে পাইনি। ’

আরেফিন খান বলেন, ‘প্রতারক রাগীব আলীর কাছ থেকে দলিল নিয়ে যিনি বাড়ির মালিকানা দাবি করছেন তিনিও জালিয়াতের কাতারে পড়েন। জালিয়াতির মামলায় রাগীব আলী ছেলেসহ জেলে রয়েছেন। ’ তিনি বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে জালিয়াতের পক্ষে কাজ করছে। আমাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা বুঝে পেয়েও বাড়িটি জালিয়াতদের দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের কাছ থেকেও সমপরিমাণ টাকা নিয়েছে তারা। অর্থাৎ এক ঋণের টাকা দুজনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাছ থেকে এমনটি কেউ আশা করে না। ’

জেলে যাওয়ার আগে রাগীব আলী সাংবাদিকদের কাছে গুলশানের ওই বাড়ি সম্পর্কে বলেছিলেন, কাগজপত্র দেখেই নজরুল ইসলাম মজুমদার বাড়িটি কিনেছেন। মামলা-মোকদ্দমার বিষয়টিও তাঁর দেখার কথা।

আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকার একটি পেশাদার জালিয়াতচক্রের সাহায্যে ওই বাড়ির একটি জাল দলিল তৈরি করেন রাগীব আলী। এ নিয়ে একাধিক মামলা হয়। বন্ধকি সম্পত্তির মালিক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক একটি মামলা করে। রায়ে জজকোর্ট, হাইকোর্ট তাঁকে জালিয়াত হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, রাগিব আলী হেরে যান।

এর আগে ২০১২ সালে বাড়িটি ৭০ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন রাগীব আলী। দলিলগ্রহীতা নজরুল ইসলাম মজুমদার জানান, তিনি নগদ ১০ কোটি এবং চেকের মাধ্যমে ৬০ কোটি টাকা দিয়ে বাড়িটি কেনেন। তিনি একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। তিনি জালিয়াতি করতে পারেন—এ কথা কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

একাধিক আইনজ্ঞ ওই বাড়ির বেচাকেনাকে আইনবহির্ভূত আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, সর্বোচ্চ আদালত রাগীব আলীর দলিল জাল বলে বাতিল করে দিয়েছেন। অতএব বাড়ির ক্রয়সংক্রান্ত দলিলও বাতিলযোগ্য।

ওই বন্ধকি সম্পত্তির বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের অভিমত চেয়েছিল ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট। জবাবে ২৬ অক্টোবর তিনি বলেন, ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ব্যাংক পাওনা বুঝে নিয়েছে। এখন নজরুল ইসলাম মজুমদারের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলে তা হবে অসদাচরণ ও ফৌজদারি অপরাধ।

জানা গেছে, সর্বোচ্চ আদালতে জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পরও চক্রটি হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তারা বাড়ির মালিকদের অজান্তে তাদের নামে ভুয়া সমঝোতা দলিল রেজিস্ট্রি করে। যে ১০ জনকে ওয়ারিশ দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয় তাঁদের দুজন থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। রেজিস্ট্রির সময় তাঁরা সেখানেই ছিলেন। এ ব্যাপারে সামসুল আরেফিন খান গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-৭২৪) করেন।

এসব ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানিয়ে সামসুল আরেফিন খান অগ্রণী ব্যাংকের এমডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং দুদক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।

অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই পরিশোধ করে না। তাদের পেছনে ঘুরেও টাকা উদ্ধার করা যায় না। অথচ ঋণের টাকা বুঝে নিয়েও বন্ধকি বাড়ি ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ঘটনাটি ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, মালিকানা বিরোধের কারণে বন্ধকি দলিল আটকে রাখা হয়েছে। ব্যাংককে না জানিয়ে জমিটি একাধিকবার বিক্রি করা হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের সবাই সব কিছু অস্বীকার করছে। বিষয়টি এখন আদালতের ওপর নির্ভর করছে। আদালত যেভাবে বলবেন সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য