kalerkantho


নিরাপত্তা রক্ষায় নারী

কাজী হাফিজ ও ওমর ফারুক   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিরাপত্তা রক্ষায় নারী

‘একজন বাবা হিসেবে মেয়ের জন্য আমি গর্বিত। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সে একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ওর সাহসিকতা ও সাফল্য দেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ’—কথাগুলো বললেন আরজেএসসির (যৌথ মূলধন কম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধক) অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর মেয়ে মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও নাজিয়ার সহকর্মী মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ারকে গত বছরের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান ফ্লাইং ব্রেভেট পরিয়ে দেন। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর এ দুই নারী অফিসার প্রথমবারের মতো বৈমানিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

মেজর নাজিয়া ও শাহরীনার মতো বাংলাদেশে আরো অনেক বাবা-মায়ের বুক গর্বে ভরে দিয়েছেন মিলিটারি একাডেমির দীর্ঘমেয়াদি কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে কমিশনপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেয়েরা। সৈনিক পদেও সাহসিকতা নিয়ে যোগ দিচ্ছেন অনেকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছেন এসব নারী।

একইভাবে বাংলাদেশ পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) যথেষ্ট সাহস ও সামর্থ্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন নারী কর্মকর্তা ও সদস্যরা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত ৬ মার্চ কালের কণ্ঠকে জানায়, সেনাবাহিনীতে বর্তমানে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা চিকিৎসকসহ সাত শ জন।

তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে কর্মরতও আছেন। আর নিয়মিত কোর্সের নারী কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ মেজর পদে কর্মরত। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখায় পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সমান মর্যাদা ও যোগ্যতা নিয়ে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। এই বাহিনীতে নারী সৈনিকের সংখ্যা এখন এক হাজার ৮০০ জন।

বিমানবাহিনীতে নারী কর্মকর্তা ১৬২ জন। তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোয়াড্রন লিডার পদে কর্মরতও আছেন। আর নৌবাহিনীতে ৯২ জন কর্মকর্তা ও ৪৪ জন নাবিক রয়েছেন। এই বাহিনীর নারীরা সর্বোচ্চ কমান্ডার পদে কর্মরত। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে এখন নারী সদস্যের সংখ্যা দুই হাজার ৭৯৮ জন। ২০০০ সালের পর থেকে এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

আলোচিত কৃতিত্বগুলো : পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্ব এবং জাতিসংঘকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল ডা. নাজমা বেগম গত বছরের ১৬ আগস্ট জাতিসংঘের বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন। তাঁকে ২০১৬ সালের জন্য ‘মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অব দি ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়।

২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এক হাজার মিটার উচ্চতা থেকে মোট ছয়বার লাফ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার হিসেবে সনদ অর্জন করেন সেনাবাহিনীর তত্কালীন ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস। একই বছরের ৮ এপ্রিল মেজর নুসরত নূর আল চৌধুরী (আর্টিলারি) বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে সফলভাবে তাঁর পঞ্চম প্যারাশুট জাম্প সম্পন্ন করেন।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে প্রথমবারের মতো নারী বৈমানিক নিয়োগের পর এ বাহিনীর দুজন নারী কর্মকর্তা নাইমা হক ও তামান্না-ই-লুিফ বৈমানিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

পুলিশ বিভাগে নারী : রাত তখন ১২টা। আসামি ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে। রাজধানীর মিরপুরে কয়েকটি জায়গায় গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা। নারী বলে টানা এই অভিযানে কোনো ঢিলেমি বা ক্লান্তি ছিল না তাঁর। আর সাম্প্রতিক সেই অভিযানের কথা জানালেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা।

রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামাঞ্চলেও নিয়মিত এমন সাহসিকতা ও কষ্টসাধ্য অভিযান পরিচালনা করছেন শত শত নারী পুলিশ। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তাঁরা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। জাতিসংঘ শান্তি মিশনেও তাঁরা নিজেদের সক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম যোগ দেওয়া ১৪ জন নারী পুলিশ দায়িত্ব পালন করতেন ইউনিফর্ম ছাড়া। দুই বছর পরই অবশ্য তাঁদের ইউনিফর্মে আনা হয়। শুরুর দিকে নারী পুলিশকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজই করানো হতো। বর্তমানে মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিআইডি, পিবিআই, ডিবিসহ প্রতিটি ইউনিটে নারী পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। অংশ নিচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ নানা অভিযানে।

বর্তমানে দেশের তিনটি জেলায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন নারী। তাঁদের একজন নরসিংদীর পুলিশ সুপার আমেনা খাতুন, চাঁদপুরে এসপি শামসুন্নাহার ও রাজবাড়ীর এসপি সালমা বেগম।

এবারের পুলিশ সপ্তাহে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য অন্যদের সঙ্গে তিনজন নারী সদস্যকেও বিপিএম পিপিএম পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন চাঁদপুরের এসপি শামসুন্নাহার, র‌্যাব-৭-এর সিনিয়র এএসপি শাহেদা সুলতানা ও এসবির এএসপি শাওন শায়লা।

বিশাল পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে একজন নারী অতিরিক্ত আইজিপির দায়িত্বে রয়েছেন। ডিআইজি রয়েছেন দুজন। অতিরিক্ত ডিআইজি দুজন। পুলিশ সুপার পদবির আছেন ২৯ জন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ৭০ জন, সিনিয়র এএসপি ও এএসপি মিলিয়ে আছেন ১৪৪ জন, ইন্সপেক্টর ৯১ জন, সাব-ইন্সপেক্টর ৫৩৭ ও সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর ৬২০ জন। কনস্টেবল রয়েছেন ৯ হাজার ৫৪২ জন।   এ ছাড়া গত বছর প্রথমবারের মতো ২৮ জন নারী সার্জেন্ট যোগ দিয়েছেন। তাঁরা এখন রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সঙ্গে।

মাদক রোধে বিজিবির নারী সৈনিক : বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিতে বর্তমানে ১৯০ জন নারী সৈনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা সীমান্তে টহলের মতো কাজে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হলেও মাদক নিয়ন্ত্রণে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে টহলের দায়িত্বেও শিগগিরই এসব নারী সদস্যকে দেখা যাবে বলে জানিয়েছে বিজিবির একটি সূত্র।

বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, এত দিন সীমান্ত পথে নারী মাদক পাচারকারীরা কৌশলে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মাদক বেঁধে নিয়ে চেকপোস্ট পেরিয়ে যেতে পারত। বিজিবির নারী সৈনিকরা যোগ দেওয়ার পর তা অনেকটাই কমে এসেছে।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহসিন রেজা জানান, বিজিবির নারী সৈনিকরা হিলি, বোনাপোল বন্দরেও কাজ করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন চেকপোস্টে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।


মন্তব্য