kalerkantho


১২ কনটেইনারে মিলল ১৩৪ কোটি টাকার সিগারেট,মদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



১২ কনটেইনারে মিলল ১৩৪ কোটি টাকার সিগারেট,মদ

চট্টগ্রাম বন্দরে আটক ১২ কনটেইনারে ১৩৪ কোটি টাকার পণ্য পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে আনা এসব পণ্যের মধ্যে পাঁচটি ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট, ছয়টি ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, সনি ও স্যামসাং ব্র্যান্ডের এলইডি ও এইচডি টিভি, ফটোকপি মেশিন ও যন্ত্রাংশ এবং কিছু গুঁড়া দুধ পাওয়া গেছে।

১২ কনটেইনারের কোথাও ঘোষিত মূলধনী যন্ত্রপাতির সন্ধান মেলেনি।

ধারণা করা হচ্ছে, মূলধনী যন্ত্রপাতির ১ শতাংশ শুল্ক দিয়ে ৬০০ শতাংশ শুল্কের এসব পণ্য আমদানি করা হয়েছে। কাস্টমস ও বন্দরকে ম্যানেজ করে এগুলো বন্দর থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি হিসেবে খালাস করা হতো। কিন্তু শুল্ক গোয়েন্দা দলের তত্পরতার কারণে সেগুলো ধরা পড়ে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দরের বহির্নোঙরে আসার পর থেকেই আমরা ১২ কনটেইনারের নজরদারি শুরু করি। একপর্যায়ে কনটেইনারগুলো বন্দরে না নামিয়ে সাগরে ফেলে দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল। বন্দরে নামার পর সেগুলো ভুলক্রমে চট্টগ্রাম আসছে বলে মেইল করা হয়েছে। সব কিছু ঠেকিয়ে আমরা সব কনটেইনারের পণ্য গণনা বা কায়িক পরীক্ষা শেষ করি। এতে ১৩৪ কোটি টাকার অবৈধ পণ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর যাতে কোনো পণ্য চোরাচালানের রুট হতে না পারে, একই সঙ্গে কেউ বা কোনো চক্র বন্দর ব্যবহার করে যাতে রাতারাতি ধনী হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা সচেষ্ট। এর মাধ্যমে বৈধ ব্যবসায়ী যারা সঠিক রাজস্ব পরিশোধ করে ব্যবসা করছে তাদের জন্য ভালো ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করেছি। ’ 

জানা গেছে, পোল্ট্রি ফিড উত্পাদনের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণায় চীন থেকে দুটি চালানে ১২ কনটেইনার পণ্য আমদানি করেন খোরশেদ আলম। ঢাকার খিলক্ষেত সাত নম্বর ওয়ার্ডের ধুমনি এলাকার ‘হেনান আনহুই অ্যাগ্রো এলসি’ ও চরগোলগোলিয়া আবদুল্লাহপুর কেরানীগঞ্জের অ্যাগ্রো বিডি লিমিটেডের নামে দুটি চালানে ১২ কনটেইনার পণ্য নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি এমভি ভাসি সাঙ এবং ৩ মার্চ এমভি সিনার সুভাং জাহাজ বহির্নোঙরে আসে। চালানটি খালাসে আমদানিকারকের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ হচ্ছে চট্টগ্রামের ধনিয়ালাপাড়ার রাবেয়া অ্যান্ড সন্সের মালিক জালাল আহমেদ। ৩ মার্চ প্রথম চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে নামানোর পর সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। এর পরই চালানটি আটক করে রাখা হয়। পরে ৪ মার্চ আরো ছয় কনটেইনার জাহাজ থেকে নামিয়ে বন্দরের এনসিটি টার্মিনালে রাখা হয়।

রবিবার বন্দর ইয়ার্ডে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রথম দিন চারটি এবং গতকাল বাকি আটটি কনটেইনার খুলে পণ্য গণনা করা হয়।

গণনার সময় গতকাল চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার এ এফ এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ রাবেয়া অ্যান্ড সন্সের লাইসেন্স বাতিল করে সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ’

১২ কনটেইনার খুলে যা পাওয়া গেল : আটটি বিদেশি ব্র্যান্ডের মদ পাওয়া গেছে ১৬ হাজার ১৭০ বোতল। ওজন হিসেবে যা ১৬ হাজার ১৬৮ লিটারে ৬০০ শতাংশ হিসাবে বাজারমূল্য ১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্ল্যাক লেবেল ব্র্যান্ডের মদ পাওয়া গেছে এক হাজার ২০০ বোতল, রয়াল সেলুট ছয় বোতল, শিভাস রিগাল এক হাজার ১৮৮ বোতল, ১০০ পাইপারস তিন হাজার ৬০০ বোতল, ভ্যালেন্টাইনস তিন হাজার ৬০০ বোতল, টাকিলা সিলভার ৬০০, ভদকা দুই হাজার ৩৫২ বোতল, পাসপোর্ট তিন হাজার ৬২৪ বোতল। বিদেশি বেনসন অ্যান্ড হেজেস, ইজি, মন্ড, ৩০৩ এবং জো ব্ল্যাক ব্র্যান্ডের সিগারেট পাওয়া গেছে ৭০ কোটি টাকার। এতে শলাকার পরিমাণ ছিল তিন কোটি ৮৪ লাখটি।  

এ ছাড়া সনি, স্যামসাং, প্যানাসনিক ব্র্যান্ডের ৩২ থেকে ৯০ ইঞ্চি এলইডি, এইচডি ও কার্ভ টিভি পাওয়া গেছে চার হাজার ৭৪টি। এগুলোর বাজারমূল্য ৪৫ কোটি টাকা। তোশিবা ও স্যামসাং ব্র্যান্ডের আমদানি নিষিদ্ধ পুরনো ফটোকপি মেশিন মিলেছে ২৮১টি, যেগুলোর বাজারমূল্য দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ ছাড়া নিডো ব্র্যান্ডের কিছু গুঁড়া দুধও মিলেছে।

আমদানি ও রপ্তানিকারক দুটি প্রতিষ্ঠানই ভুয়া : দুটি চালানে পণ্যের আমদানিকারক খোরশেদ আলম। তিনি ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ঢাকার মতিঝিলের আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণপত্র খোলেন। সেখানে আর বিআইএন বা বিজনেস আইডি নাম্বার ও ভ্যাট লাইসেন্স ভুয়া। শুল্ক গোয়েন্দারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

একই সঙ্গে চীনের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জমরাজ ইন্ডাস্ট্রি ভুয়া। ঋণপত্রে যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। আর নেই কোনো ওয়েব ঠিকানাও।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তারিক মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাত্র কায়িক পরীক্ষা শেষ করলাম। এর সঙ্গে কারা জড়িত, সব ফাইন্ডিংস নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে মামলা করা হবে। একটি বিভাগীয় মামলা এবং আরেকটি ফৌজদারি মামলা। আর আটককৃত পণ্য আপাতত চট্টগ্রাম বন্দরের জিম্মায় সিলগালা করে রাখা হবে। রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের পর নিলাম ডেকে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা করা হবে। ’ 


মন্তব্য