kalerkantho


জঙ্গিবাদ প্রচারের জন্য ইংরেজি শিখছিলেন আবুল কাশেম

এস এম আজাদ   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জঙ্গিবাদ প্রচারের জন্য ইংরেজি শিখছিলেন আবুল কাশেম

মুফতি আবুল কাশেম আরবি বিষয়ে দক্ষ। তিনি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দাবিকসহ জঙ্গিবাদবিষয়ক বিভিন্ন প্রচারপত্রের আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। আরবি ও বাংলায় লিখেছেন কয়েকটি জিহাদি বই ও নিবন্ধ।

আরবি ভাষায় ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়ে শ্রুতিমধুর বয়ান করেন তিনি। এ কারণে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পুরনো ও নতুন ধারার অনেকেই তা শুনতেন। ‘বড় হুজর’ খ্যাতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও তাঁর বয়ান শুনতে আসত অনেক উগ্র মতাদর্শী যুবক। তবে ইংরেজি জানতেন না বলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছিলেন না তিনি।

একপর্যায়ে ইংরেজি শিখে বয়ান করার পাশাপাশি নিজের বয়ান বা ব্যাখ্যা ইংরেজিতে অনুবাদ করার চিন্তা করেন আবুল কাশেম। এ আগ্রহ প্রকাশ করলে নব্য জেএমবির সহযোগীরা তাঁকে ইংরেজি শেখানো শুরু করে।

সাত দিনের রিমান্ডে থাকা নব্য জেএমবির আধ্যাত্মিক নেতা আবুল কাশেম জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তাদের।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আবুল কাশেমের কাছ থেকে ‘আরবি টু ইংরেজি’ একটি অভিধান উদ্ধার করা হয়েছে।

‘দাওলার আসল রূপ’, ‘জিহাদ কেন করবেন’, ‘ইসলামি বসন্ত’ নামের তিনটি জঙ্গিবাদী বই ছাড়াও বেশ কিছু জিহাদি লেখা পাওয়া গেছে তাঁর ডেরায়। এসব লেখায় তিনি ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে হত্যা, তাদের ওপর হামলার বিষয়ে মত দিয়েছেন।

সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৪ সালের দিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের তামিম চৌধুরীর বিষয়ে জানায়। ওই সময়ই আমরা তথ্য পাই, একজন বড় হুজুর আছেন। সেই হুজুর ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও অপারেশনের অনুমোদন দেন। সবাই তাঁকে মান্য করে। প্রথমে তাঁকে শনাক্ত করা যায়নি। ২০১৫ সালের দিকে আবুল কাশেম নামের বড় হুজুরের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। দিনাজপুরে তাঁর অবস্থান জানার পরই জানা গেল তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। ’

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর সেনপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আবুল কাশেমকে। শুক্রবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত তাঁর সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। গতকাল রবিবার ছিল রিমান্ডের তৃতীয় দিন।

সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নব্য জেএমবির নেতাদের সম্পর্কে এবং তাঁর বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য দিচ্ছেন। তিনি কোনো হত্যা বা হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের উত্তর কোদালকাটি গ্রামের বাড়ির কাছেই তিনি বয়ান শুরু করেন। তিনি জেএমবির আদর্শ প্রচার করেন। দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে জেএমবি সদস্যদের কাছে দ্রুত তিনি প্রিয় হয়ে ওঠেন। মাঝে কিছু দিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পরে দিনাজপুরের রানীরবন্দরের ওকরাবাড়ী মাদরাসার অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ফের বয়ানে সক্রিয় হন। সে সময় তাঁর কাছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে উগ্রপন্থীরা আসতে শুরু করে। তিনি দিনাজপুর, রাজশাহী ও ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি মাদরাসায় বিদেশিদের সঙ্গে দেখা করতেন।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়ায় যাওয়া উগ্রপন্থী, বিদেশি এবং শিক্ষিত অনেক উগ্রপন্থী যুবকের সঙ্গে আবুল কাশেমের পরিচয় রয়েছে। ইংরেজি না জানার কারণে তিনি তাদের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছিলেন না। তামিম চৌধুরী, মারজান, হাতকাটা মাহফুজ, উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডার রাজীব গান্ধীসহ অনেকে তাঁর অনুরক্ত ছিল। তারা সবাই তাঁকে ইংরেজি শেখার ব্যাপারে তাগিদ দেন। ইংরেজি শিখে বয়ান দেওয়ার পাশপাশি বই লেখার চিন্তা করেন তিনি। সহকর্মীদের সহায়তায় এক বছর আগে ইংরেজি শেখা শুরু করেন। আরবি থেকেই তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ শিখছিলেন। ’

সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, ২০১৩ সালে তামিম চৌধুরীকে বড় হুজুর কাশেমের কাছে নিয়ে যায় পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা আব্দুস সামাদ ওরফে মামু ওরফে আরিফ। সঙ্গে ছিল কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি আব্দুল্লাহ। সামাদের সঙ্গে তামিম চৌধুরীর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সিরিয়ায় চলে যাওয়া এ টি এম তাজউদ্দিন। পরে সামাদ ও তামিম একাধিকবার বড় হুজুরের সঙ্গে বৈঠক করে। তিনি নব্য জেএমবির মতাদর্শ গ্রহণ করে সবাই তামিমকে মান্য করতে বলেন। আবুল কাশেমকে শায়খ বলে ডাকত তামিম। অন্যরা তাঁকে বড় হুজুর ডাকত। গুলশান হামলার বিষয়ে বড় হুজুরই অনুমোদন দেন। তিনি শায়েখ আবু মোহাম্মদ আইমান হাফিজুল্লাহ ছদ্মনামে বই লিখেছেন।

সূত্র জানায়, গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িত জেএমবির পুরনো সদস্যদের সঙ্গে নতুন কিছু সদস্যও ছিল। সবাইকে ‘এখনই জিহাদের শ্রেষ্ঠ সময়’ বলে উদ্বুদ্ধ করতেন আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাসহ সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁর সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য মেলেনি। তাঁর পরামর্শ বা অনুমোদনে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। তাঁর সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।


মন্তব্য