kalerkantho


রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ উপনির্বাচন আজ

ভোটের জনসভায় এমপি চাইলেন নৌকায় ‘সিল’

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভোটের জনসভায় এমপি চাইলেন নৌকায় ‘সিল’

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর একটি জনসভায় গত শনিবার সন্ধ্যায় বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মাহাবুবুর রহমান তালুকদার। ছবি : কালের কণ্ঠ

শনিবার সন্ধ্যা। মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ মানুষে। সামনের বিশাল মঞ্চে অতিথিরা। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে মাইকে ঘোষণা আসে, ‘রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ উপনির্বাচনে আজকের এ জনসমুদ্রে এবার বক্তব্য রাখবেন পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মাহাবুবুর রহমান তালুকদার। ’

এরপর এমপি মাহাবুব প্রায় ১৭ মিনিট বক্তব্য দেন। নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে তিনি বক্তব্যে বলেন, ‘রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে নৌকা মার্কায় ভোট দিলে রাঙ্গাবালীতে বিদ্যুৎ আসবে। রাস্তাঘাটের উন্নতি হবে। হাসপাতাল হবে। এলাকায় সব ধরনের উন্নয়ন হবে। তাই নৌকার বিকল্প নাই। ৬ মার্চের নির্বাচনে সবার কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই।

’ আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গত শনিবার বিকেলে উপজেলার ছোট বাইশদিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা মাঠে ওই সভা হয়। সভায় ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এম বি এম আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

বিকেল ৪টায় সভা শুরু হয়ে শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টায়। সভাস্থলের ছবি তোলায় ছিল নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি দফায় দফায় মাইকে ঘোষণাও দেওয়া হয়। একাধিক যুবক মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় সভায় সংসদ সদস্যের বক্তব্য দেওয়ার ছবি তুলতে গেলে ফোন কেড়ে নেয় (পরে ফেরত দিয়েছেন) ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকর্মীরা। সাংবাদিকদের ছবি তোলায়ও ছিল কড়া নজরদারি।

এ ব্যাপারে সংসদ সদস্য মাহাবুবুর রহমান তালুকদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তিনবার ফোন কেটে দেন এবং দুইবার ফোন ধরেননি।

নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাঙ্গাবালী উপজেলা চেয়ারম্যান পদের নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একাধিক সহিংস ঘটনা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ছোট বাইশদিয়া গ্রামের মধ্যবয়সী সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘সবই চলছে সাবেক সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন সাহেবের নিয়মে। কী নির্বাচন আর কী ভোট হবে। নতুন সিইসি কে এম নূরুল হুদা সাহেব আমার জেলার লোক। তিনি আসার পর ভোট দিতে পারব, এ রকম একটা সাহস জেগেছিল মনে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন দেখছি না। ’

সুমন বলেন, ‘ঢাকায় থাকি, ব্যবসা করি। অনেক দিন পর দেশে এসেছি। ভাবলাম, ভোট দিয়ে যাব। কিন্তু যে পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়াই হবে মহাবিপদ। ইতিমধ্যে দুই দফা মারামারি হয়েছে। রক্ত ঝরেছে ৩০-৪০ লোকের। অচেনা মানুষে ভরা এলাকা। স্থানীয় মানুষ ভয়ে আছে। আমরা তো শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু পরিবেশ চাই সব সময়। ’ প্রায় একই ধরনের কথা বলেন ওই এলাকার কৃষক মো. আমজাদ আলী ফকির ও মো. শাহাদুল খাঁ। কোড়ালিয়া গ্রামের আব্দুর রহিম মাঝি বলেন, ‘আগের উপজেলা ইলেকশোনের সময় যেইরোম (যে রকম) মারামারি আর গণ্ডগোল অইছে, অ্যাহন একই কাজ অইতে আছে। ’

নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলার খালগোড়া বাজারের চৌরাস্তা এলাকায় ও গত শুক্রবার বিকেলে মৌডুবি বাজার এলাকায় আওয়ামী লীগকর্মীরা বিএনপির পথসভায় হামলা করে। এতে প্রায় ৪০ বিএনপিকর্মী আহত হয়। এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন আকন নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জাহাঙ্গীর হোসেন আকন অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের কর্মকর্তারা সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। একাধিকবার হামলা ও সহিংসতা ঘটিয়েছে তারা, অথচ মারামারির মিথ্যা অভিযোগে শনিবার গভীর রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি কবির হোসেন তালুকদারকে। সার্বিক পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে। সিইসি আমার পটুয়াখালীর লোক। আশা করছি, তাঁর এলাকার ইজ্জত রক্ষার্থে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হবে। ’

আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী প্রতিপক্ষ হিসেবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে কিছু সুবিধা তো নিতে চাইবেই। আমার সমস্ত পোস্টার, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছে তাঁর (জাহাঙ্গীর হোসেন আকন) লোকজন। তাঁর আত্মীয়স্বজন যারা নৌকার সমর্থক তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমি চাই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ। বরং তিনি পরিবেশ বিঘ্নিত করছেন। এমপি সাহেব নির্বাচনী কোনো প্রচারে অংশ নেননি। তিনি অন্য একটি প্রগ্রামে রাঙ্গাবালী এসেছিলেন। ’

২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের দরবার হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিনিধির এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। যাঁর ভোট তিনি দেবেন। এ জন্য পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা গঠিত একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকবে। ’


মন্তব্য