kalerkantho


আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে ৭ কর্মকর্তার পদোন্নতি

নিখিল ভদ্র   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ২০০৫ সালে অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে অবসর নেন। এর আগে পদোন্নতি পাওনা থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাঁর মতো আরো ছয় কর্মকর্তা ওই সময় পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে অবসরে যান। ২০০৯ সালে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নিলে আদালত তাঁদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কয়েক দফা আলোচনা শেষেও একই সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এখনো তাঁদের পদোন্নতি হয়নি। আর এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলেছে সংসদীয় কমিটির বিগত দুটি বৈঠকে।

কমিটি সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে আলোচনাকালে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা আদালতের রায় ও কমিটির সুপারিশ সত্ত্বেও ওই সাত কর্মকর্তা (যাঁদের একজন এরই মধ্যে মারা গেছেন) পদোন্নতি না পাওয়ায় মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কঠোর সমালোচনা করেন। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে দায়ী করেন। আবার ওই সচিব বলেছেন, পদোন্নতির জন্য তিনি ফাইল উত্থাপন করেছেন।

এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সমালোচনা করেন কমিটির সদস্যরা। আর এই আলোচনা চলাকালে জনপ্রশাসনে পদোন্নতি নিয়ে নানা অনিয়ম-বঞ্চনার কথাও উঠে এসেছে। দীর্ঘ বিতর্কের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অগ্রগতি কমিটির আগামী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

জানতে চাইলে কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন থেকে পদোন্নতিসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গোপন রাখা হবে না। সব সিদ্ধান্তই প্রকাশ করা হবে।

সংসদীয় কমিটির কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে গত জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লিখিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক সচিব আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পদোন্নতি পাওয়ার আবেদন করে একজন কর্মকর্তা মারা গেছেন। অন্যরা ২০১৪ সালে আদালতের রায় পেলেও এখনো সেই রায় বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ ২০১৫ সালে এসএসবি আদালতের রায় কার্যকর করার সিদ্ধান্তও দিয়েছিল। তিনি আরো বলেন, প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে। মন্ত্রণালয়ে মাসের পর মাস ফাইল নড়ে না। কী কারণে ফাইল আটকে থাকে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতে প্রায় ৫০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে জনপ্রশাসনসচিব জানালেও তার তালিকা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বরং অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্যরা পদোন্নতি পাচ্ছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী মুখ্য সচিব পদে যোগদানের এক দিন আগে আবদুল মোবারকসহ সাতজনের পদোন্নতির প্রস্তাব করে এসংক্রান্ত ফাইলটি প্রতিমন্ত্রী বরাবর উপস্থাপন করে গেছেন বলেও তিনি জানান।

তার বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বেগম ইসমাত আরা সাদেক। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সিনিয়র সচিব (ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী) কোনো উদ্যোগ নেননি। অথচ বদলি হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে ফাইলটি উপস্থাপন করে বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। পদোন্নতির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।

এর পরই প্রতিমন্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ জানান কমিটির সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। পদোন্নতি কিভাবে হয় প্রতিমন্ত্রী যদি তা না জানেন তাহলে কিভাবে পদোন্নতি হচ্ছে মর্মে প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় শুধু সচিব চালান না, মন্ত্রীরাও চালান। সুতরাং মন্ত্রীদের এ বিষয়ে জানা থাকা আবশ্যক।

এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, অনেক কিছু নীতিমালায় থাকে না। মতাদর্শ নীতিমালায় না থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাই ওই রায় বাস্তবায়ন না হলে পদোন্নতিবঞ্চিতরা মামলা করতে পারেন।

কমিটি সূত্র জানায়, সচিবের বক্তব্যে একমত প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রীও। এ সময় উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী আবারও রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতে ৫০ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি মনে করিয়ে দেন। দ্রুত ওই নির্দেশনা কার্যকর করার দাবি জানান কমিটির সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, অনেক দিন হয়ে গেছে। সরকার যেহেতু আপিল করেনি, সেহেতু রায় কার্যকর করতে হবে। উপরন্তু সংশ্লিষ্টরা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত অযোগ্য কর্মকর্তা ও পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের তালিকা পেয়েছেন বলেও তিনি জানান।

সব শেষে কমিটি সভাপতি এইচ এন আশিকুর রহমান বৈঠকে উত্থাপিত বিভিন্ন বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আদালতের রায় বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া কমিটি থেকেও আব্দুল মোবারকসহ ছয়জনকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ রকম আরো যেসব কেস আসছে সেগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কমিটির সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দেন তিনি।

এর আগে বৈঠকে কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না। বছরের পর বছর পদোন্নতিবঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন অনেকেই। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্নদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ না থাকলেও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক অভিযোগ এনেও অনেককে হয়রানি করা হচ্ছে। এ কারণে জনপ্রশাসনে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে দাবি তাঁদের।


মন্তব্য