kalerkantho


কটিয়াদীতে মজিবুরের নার্সারি

গাছের সঙ্গে সখ্য

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গাছের সঙ্গে সখ্য

নিজের নার্সারিতে মজিবুর রহমান। ছবি : কালের কণ্ঠ

যেন গাছের সঙ্গে কথা বলেন মজিবুর রহমান। তিনি যেভাবে চান, সেভাবেই বেড়ে উঠে গাছ, ফলনও দেয় তাঁর মনমতোই। শখের বশে শুরু করে গাছের সঙ্গে আজ তাঁর এ সখ্য। মাত্র ছয় বছরে গাছের হাত ধরে পেয়েছেন বিরাট সাফল্য, এমনকি সম্মানও। গাছের প্রতি ভালোবাসা, একাগ্রতা ও পরিশ্রম তাঁকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। পরিণত হয়েছেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে। এখন তিনি বিরল গাছগাছালি সমৃদ্ধ ব্যতিক্রমধর্মী এক নার্সারির মালিক।

এ ধরনের চোখ ধাঁধানো নার্সারি সচরাচর চোখে পড়ে না। এটাকে নার্সারি না বলে গাছের গবেষণাগারও বলা যেতে পারে। কী নেই এখানে, দেশি-বিদেশি বিরল জাতের ফলফলারির গাছ ছাড়াও ৯০ জাতের আম ও ১৪ জাতের কমলা রয়েছে এ নার্সারিতে। এক জাতের গাছে আরেক জাতের ফল হচ্ছে মজিবুরের খামারে।

তাই কেবল চারা কিনতে নয়, খামারটি ঘুরে দেখতেও ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের বৃক্ষপ্রেমীরা। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর লাংটিয়া গ্রামের ব্যতিক্রমধর্মী এ নার্সারিটি সফলতা পেয়েছে বাণিজ্যিকভাবেও।

স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে ২০১০ সালে ছোট করে শুরু করলেও এখন মজিবুরের নার্সারির আয়তন প্রায় ছয় বিঘা। সেখানে তৈরি হচ্ছে শত জাতের শত শত ফলফলারির চারা। এসব চারা দিয়ে সৃজন করা হয়েছে বৈচিত্র্যময় ফলের বাগান।

বারোমাসি ফলের গাছও আছে অনেক। এ নার্সারির ফল ও চারা কিনতে শৌখিনদের লাইন থাকে সারা বছর।

আগে কটিয়াদী বাজারে লাইব্রেরি ছিল তাঁর। গাছের নেশা পেয়ে বসার পর বইয়ের ব্যবসা ছেড়ে লেগে যান গাছের পেছনে। খনাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কৃষিবিজ্ঞানী উল্লেখ করে মজিবুর রহমান বলেন, ‘খনার বচন থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আর বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে গুগলই আমার শিক্ষক। প্রতিদিন গুগল থেকে গাছগাছালি বিষয়ে অনেক কিছু শিখছি আমি। আর সেই শিক্ষাই কাজে লাগাচ্ছি আমার খামারে। ’

তাঁর বাগানে রয়েছে চায়না কমলাসহ বিভিন্ন জাতের কমলা, আম, জাম, লিচু, রামবুথান (থাই লিচু), নাশপাতি, বেল, কুল, মাল্টা, পেয়ারা, কতবেল, জামরুল, বাতাবি লেবু, টক ও মিষ্টি করমচা, বিলম্বি, ড্রাগন ফল, আমলকী, তেঁতুল, লটকন, কাউফল, তইফল, আমড়া, কামরাঙ্গা, কাঁঠাল, গোলাপ, গাদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া ইত্যাদি শতাধিক রকমের ফল ও ফুল গাছের জাত। রয়েছে নানা জাতের ঔষধি ও বনজ বৃক্ষরাজি এবং নানা জাতের মসলাগাছও। বাগানে গেলে দেখা যাবে কমলাগাছে থোকা থোকা কমলা ঝুলে আছে, আমগাছে আমের মুকুল, ড্রাগনগাছে ড্রাগন ফলসহ নানা জাতের ফল ধরে আছে। এ বাগানে বারোমাসি কমলা ও আমের জাত রয়েছে। যাঁরা তাঁর বাগান দেখতে যান, প্রথমেই তিনি ওই সব ফল দিয়ে তাঁদের আপ্যায়ন করেন। শুধু অতিথি নয়, তাঁর বাগানের ফল খেতে আসে প্রচুর পাখিও। এসব করেই আনন্দ পান তিনি।

মজিবুর রহমান বলেন, ‘একটা সময় ছিল, কেমিক্যালের ভয়ে লোকজন ফল খেত না। তখন খুব খারাপ লাগত। ওই সময়টাতেই ভাবনাটা মাথায় আসে। ফলফলাদি নিয়ে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। সেই চিন্তা থেকেই সব কিছু ভুলে লেগে গেলাম নার্সারি তৈরির কাজে। ’

নার্সারিতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক জানান, খামারের জন্য এখনো দিন-রাত পরিশ্রম করেন মজিবুর। যখন যেখানেই নতুন জাতের ফল, ফুল বা অন্য কোনো উদ্ভিদের সন্ধান পান, ছুটে গিয়ে সেটি সংগ্রহ করে নিজের বাগানকে সমৃদ্ধ করেন। এ কাজে তার কোনো আপস বা আলস্য নেই।

তিনি বিভিন্ন ফলের কলম তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন। এসব কলমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাতাবি লেবুর চারার সঙ্গে ‘ক্লেফট গ্রাফটিং’ করা কমলার কলম। তিনি জানান, প্রথমে ছোট পলিথিনের ব্যাগে বাতাবি লেবুর বীজ থেকে চারা উৎপাদন করেন। এরপর ছোট চারার ওপরের অংশ কেটে এর সঙ্গে ফলনশীল কমলা গাছ থেকে ‘সায়ান’ (সরু ডালের আগা) সংগ্রহ করে বাতাবি চারার কাটা অংশে স্কচটেপের সাহায্যে সেঁটে দেন। কয়েক দিনের মধ্যেই দুই প্রজাতির সম্মিলন হয়ে কমলার চারায় পরিণত হয়।

ফলনশীল কমলা গাছের সায়ান ব্যবহূত হয় বলে এক বছরের মধ্যেই গ্রাফটিং কলমের চারায় কমলা ধরে। এ গাছ থেকে যে কমলা হয়, এর স্বাদ আর পুষ্টিগুণও কমলার মতো। তিনি আম, কুলসহ আরো কিছু ফলেরও গ্রাফটিং করছেন। এ নার্সারিতে রয়েছে ১৪ ইঞ্চি লম্বা ‘কিউজাই’ জাতের আমের চারাসহ ৯০ প্রজাতির উন্নত জাতের আমের চারা। একটি কিউজাই আমের ওজন এক কেজি পর্যন্ত হয়।

বাগানের উদ্যোক্তা মজিবুর রহমান বলেন, ‘এসব করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে গেছি। পরিকল্পনামতো খামারটি সাজাতে পারছি না। অনেক ব্যাংক আমার বাগান ঘুরে দেখেছে। দিয়েছে প্রতিশ্রুতিও, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। ’ তিনি বলেন, ৮-১০ লাখ টাকা ঋণ পেলেই তিনি কোটি টাকার চারা বেচতে পারবেন আগামী এক বছরে। তাই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে ভালো হতো।

মুমুরদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. সৈয়দুজ্জামান সৈয়দু বলেন, তাঁর বাগানে না গেলে বোঝা যাবে না, তিনি কত উঁচুমানের রুচিশীল খামারি। এ ধরনের বাগান খুব কমই দেখা যায়। এলাকার লোকজনও তাঁর খামার নিয়ে গর্ব করে। তা ছাড়া এসব বিষয়ে কেউ কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা চাইলে অকৃপণভাবে এগিয়ে আসেন তিনি।

কটিয়াদী কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, অনুকরণীয় উদ্যোগের কারণে ২০১২ সালে মজিবুর রহমান জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে সব সময় সহযোগিতা দেওয়া হয়।

স্থানীয় লোকজন মনে করেন, মজিবুরের প্রচেষ্টাকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে দেশীয় ফলের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সৃষ্টি হবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এ ধরনের সৃজনশীল উদ্যোক্তারা যেন হতাশ না হন, সংশ্লিষ্টদের সেদিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।


মন্তব্য