kalerkantho


দুর্গম চরে জঙ্গি আস্তানা করেছিলেন কাশেম

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দুর্গম চরে জঙ্গি আস্তানা করেছিলেন কাশেম

ঢাকায় পুলিশ হেফাজতে থাকা নব্য জেএমবির ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ আবুল কাশেমের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার দুর্গম উত্তর কোদালকাটি চরে। প্রথমে তিনি অষ্টমীচর ইউনিয়নের ডাটিয়ারচর বাজারে পল্লী চিকিৎসক এবং হাফেজিয়া মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন।

জঙ্গিদের কাছে ‘বড় হুজুর’ হিসেবে পরিচিত কাশেম ২০০৪ সালের গোড়ার দিকে ওই হাফেজিয়া মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে মাদরাসার শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হতো এই দুর্গম চরে। সারা রাত চলত প্রশিক্ষণ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামালার পর চরের বাসিন্দারা জোটবদ্ধ হয়ে মাদরাসাটি গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর আবুল কাশেম এলাকা ছেড়ে চলে যান। গতকাল শনিবার চরের বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ব্রহ্মপুত্র নদের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের অংশ ডাটিয়ারচরের মজিবুর রহমান, সোলেমান মাস্টার, করিম মণ্ডল ও ইদ্রিস আলী জানান, আবুল কাশেম ডাটিয়ারচর হাফেজিয়া মাদরাসাকে জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। কাশেম তখন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অপরিচিত যুবক, তরুণ ও কিশোররা সেখানে যেত।

রাতে মাদরাসায় হতো আলোচনা। তাদের সবার খাবার রান্না হতো কাশেম ‘হুজুরের’ বাড়িতে। মজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রথম প্রথম চরের মানুষ অতটা বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু দেশজুড়ে গ্রেনেড হামলার পর আমরা বুঝতে পারি যে ওটা ছিল জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। পরে তো চরের মানুষ ওই মাদরাসা ভেঙে দেয়। এরপর আবুল কাশেমকে আর দেখা যায়নি। ’ মজিবুরের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন অন্যরাও।

যে স্থানে ওই হাফেজিয়া মাদরাসা তথা কাশেমের জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ছিল সেই স্থান এখন আর নেই। ব্রহ্মপুত্রগর্ভে হারিয়ে গেছে।

জানা গেছে, আবুল কাশেম সুন্দর করে বয়ান দিতেন। তাঁর বয়ানে আকৃষ্ট হতো লোকজন। ফলে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে জেএমবি সদস্যদের কাছে দ্রুত তিনি ‘জনপ্রিয়’ হয়ে ওঠেন।

ডাটিয়ারচর থেকে তাড়া খেয়ে আবুল কাশেম রাজীবপুরের করাতিপাড়া ও জিয়ারার চরেও জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র খোলার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রথমে হাফেজ বানানোর কথা বলে মাদরাসা চালু করতেন তিনি। পরে রাতে সেখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। রাজীবপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্রামেও ওই কাশেম হুজুর মক্তব আর হাফেজিয়া মাদরাসা চালু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার কার্যক্রম ও চলাফেরা বিতর্কিত হওয়ার কারণে তা হতে দেওয়া হয়নি। ’

রাজীবপুরের কোদালকাটি ইউনিয়নের উত্তর কোদালকাটি চরে আবুল কাশেমের বাড়িতে দোচালা দুটি টিনের ঘর। তাঁর সাত ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সাইফুল্লাহ গাইবান্ধা, বগুড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুরে বিভিন্ন কওমি মাদরাসায় লেখাপড়া করেছেন। বর্তমানে তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। মেয়ে আমাতুর রহমানও ময়মনসিংহের একটি মাদরাসায় লেখাপড়া করেছেন। ছেলে আব্দুর রহমান ও আব্দুল্লাহ রৌমারী কাঁঠালবাড়ি কওমি মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। হিজুবুল্লাহ ও হাবিবুল্লাহ বাবার সঙ্গে থেকে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার অকড়াবাড়ি হামিদিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় লেখাপড়া করতেন। নাসির উল্লাহ, অলিউল্লাহ, আয়শা খাতুন ও তহিরা খাতুনের বয়স ১০ বছরের নিচে।

আবুল কাশেমের স্ত্রী মমতাজ বেগম বলেন, ‘উনি (স্বামী) গত বছর ১৬ মে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি। জঙ্গি হামলার সঙ্গে আমার স্বামী জড়িত নাই। ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে অন্যায়ভাবে চক্রান্ত করে আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। ’ বড় ছেলে সাইফুল্লাহ বলেন, ‘আগে বাড়ির খরচের টাকা পাঠাত বাবা। কিন্তু প্রায় ১১ মাস হলো কোনো টাকা-পয়সা পাঠায়নি। আমাদের আয়রোজগারের কোনো পথ নেই। ’

উত্তর কোদালকাটির ইউপি মেম্বার কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা তো জানি আবুল কাশেম জঙ্গি নেতা। সে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গি হিসেবে গড়ে তোলে। ’ একই ধরনের কথা বলেন কোদালকাটি ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির ছক্কু।

আবুল কাশেমকে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টোররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পরদিন শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।


মন্তব্য