kalerkantho


রংপুরে চারার খোঁজে ছুটছে বোরো চাষিরা

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার চারার তেমন ঘাটতি নেই

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বোরো ধান আবাদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। শেষ সময়ে এসে রংপুরের কৃষকরা বোরো ধানের চারার সংকটে পড়েছে।

এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এক শ্রেণির মানুষ চারার উচ্চমূল্য হাঁকাচ্ছে। আবার পর্যাপ্ত পরিমাণ ও ভালো মানের চারাও পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকের বীজতলা থেকে চারা চুরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে বিপাকে আছে বোরো চাষিরা।

কৃষকরা জানায়, আগে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমিতে বীজতলা করায় চারার ঘাটতি তেমন হতো না। কিন্তু এখন জমির স্বল্পতা ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে সবাই হিসাব করে চারা তৈরি করে। এর পরও যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ কোনো কারণে চারার সংকট হয়; সে ক্ষেত্রে অন্য কৃষকের অতিরিক্ত বীজতলা কিনে ঘাটতি মোকাবিলা করা হতো। এখন সে সুযোগ নেই। তাই ‘ভালো বীজে ভালো ফলন’ স্লোগানটি আধুনিক কৃষির সঙ্গে যোগ হলেও সেদিকে তাকানোর সুযোগ নেই চারা সংকটে ভোগা কৃষকদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই বোরোর চারার সংকটকে সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলের হাটবাজারে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত চারা বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকসহ বর্গা চাষিরা ঝক্কিঝামেলা এড়াতে বাজারের চারার ওপরই নির্ভর করে। এ সুযোগকে পুঁজি করে চারার বাজার জমজমাট করে তুলেছে ব্যবসায়ীরা। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় দেখা গেল, এখন চায়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে বোরো ধানের চারা। গঙ্গাচড়ায় বাজারগুলোতে বোরোর চারা বিক্রি হচ্ছে প্রতি গণ্ডা (বড় আকারের চার মুঠা) চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়।

প্রতিবছর শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে কোল্ড ইনজুরিতে বোরো ধানের চারার কিছুটা ক্ষতি হয়। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে চারা সংকটের কারণে প্রতি রাতে বীজতলা থেকে চুরি হয় ধানের চারা। দু-একজন কৃষক অনেক কষ্টে চারা রক্ষা করলেও তার দাম আকাশচুম্বী। এ কারণে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা শেষ সময়ে বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।

গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়াইবাড়ী হাটে গিয়ে জানা যায়, চায়ের দোকানে বোরো ধানের চারা বিক্রি হচ্ছে। দোকানটিতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা সেখান থেকে কিনে নিচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী চারা। চারা কিনতে আসা মণ্ডলের হাট এলাকার কৃষক বেলাল হোসেন জানান, কোথাও চারা মিলছে না। এখানে প্রতি গণ্ডা চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। উপজেলার পাইকান এলাকার কৃষক ইব্রাহীম আলী জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চারা রোপণ করতে প্রায় ৬৬০ মুঠা চারা প্রয়োজন। যার দাম পড়ে তিন হাজার ৩০০ টাকা। দোকানদার আব্দুল জলিল জানান, বীজতলা থেকে চারা চুরি হওয়ায় বিপাকে পড়েন তিনি। তাই তাঁর চায়ের দোকানে এনে চারা বিক্রি করছেন।

রংপুরের লালবাগ হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির জন্য চারা উঠলেও দাম বেশি হওয়ায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কৃষকরা। এখানেও প্রতি গণ্ডা চারা ২০ টাকার নিচে মিলছে না। চারা কিনতে আসা পাশের বড়বাড়ী এলাকার কৃষক ওছমান আলী জানান, জমিতে রোপণের জন্য তিনি বীজতলা করেছিলেন। কিন্তু কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে চারা কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আলু তুলি এখন ওই জমিত বোরো নাগবার কতা। তয় এত দামে চারা কিনলে হামার পোষবার নয়। ’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় পাঁচ লাখ দুই হাজার ২৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরে এক লাখ ৩৩ হাজার ৪২৪ হেক্টর জমি। বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই পাঁচ জেলায় ২৮ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। এক হেক্টরের বীজতলার চারা দিয়ে ২০ হেক্টর জমি রোপণ করা সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী জানান, ১৫ মার্চ পর্যন্ত বোরো আবাদের সময়। চারা লাগানো প্রায় শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে হারে চারা লাগানো হচ্ছে তাতে ওই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে চারার তেমন ঘাটতি নেই। আলু উত্তোলনের পর শেষ পর্যায়ে পরিকল্পনা ছাড়াই বোরো চাষ করছে এমন দু-চারজন কৃষকের চারার ঘাটতি পড়লেও তারা বিভিন্ন স্থান থেকে ম্যানেজ করে নিচ্ছে। বোরো আবাদে তীক্ষ নজরদারিসহ চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।


মন্তব্য