kalerkantho


হকার খোকন মোল্লা হত্যাকাণ্ড

রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে খুনিরা!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে খুনিরা!

চাঁদনীচক মার্কেটে হকার খোকন মোল্লা হত্যা মামলার প্রধান আসামি ভয়ংকর সন্ত্রাসী সাহাবুদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত আট দুর্বৃত্ত এখনো ধরা পড়েনি। তারা আত্মগাপনে থাকলেও এখনো এই সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রভাব রয়েছে মার্কেটে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ইন্ধনদাতা হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও নাম পেয়েছে পুলিশ। তাঁদের ছত্রচ্ছায়ায়ই মার্কেটটিতে চলছে নীরব চাঁদাবাজি—অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

হকার খোকন হত্যার পরপরই সরেজমিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। গতকাল ফের সরেজমিনে চাঁদনীচক মার্কেটে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, খোকন মোল্লা খুনের পর মার্কেটের কয়েক হাজার ব্যবসায়ী আছেন চরম আতঙ্কে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ক্রেতাদের জন্যও মার্কেটটি স্বস্তির নয়। ফুটপাতের শতাধিক দোকানের দখল নিয়ে আগের মতোই রয়েছে বিরোধ। মার্কেট সমিতির লোকজন বারবার পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উঠতি সন্ত্রাসীরা প্রায়ই মার্কেটটিতে এসে চাঁদাবাজি করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, চাঁদনীচক মার্কেটকেন্দ্রিক আন্তত ২০-৩০ জন উঠতি সন্ত্রাসীর প্রভাব রয়েছে সেখানে। এদের শেল্টার দেন স্থানীয় বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা।

নেতারা এসব দুর্বৃত্তকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল, মিটিংসহ মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। নিয়মিত চাঁদা নেন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় থানা পুলিশের সোর্সদের পাশাপাশি কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। এঁরা নেপথ্যে থেকে দুর্বৃত্তদের অপকর্মে সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে অবৈধ অর্থের ভাগ পান তাঁরা।  

চাঁদনীচক মার্কেট বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী চার গ্রুপের নিজস্ব কোন্দলের জের ধরেই হকার খোকন খুন হয়েছিল। ওই খুনের পর থেকে মার্কেটে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের সম্পর্কে স্থানীয় থানা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁরা। পুলিশ তাঁদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

জানতে চাইলে নিউ মার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, হকার খোকন মোল্লা হত্যার পর স্বাভাবিকভাবে মার্কেটটিতে কিছুটা আতঙ্ক রয়েছে। তবে প্রতিমুহূর্তে তাঁরা চাঁদনীচক মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে মার্কেটের ফুটপাতসহ মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নাম পরিচয় পেয়েছেন। তথ্য যাচাইবাছাই করে অভিযুক্ত আপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ফুটপাত দখল করে ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা আর চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরেই গত ২২ ফেব্রুয়ারি খুন হন চাঁদনীচক মার্কেটের ফুটপাতের ব্যবসায়ী হকার খোকন মোল্লা। ওই ঘটনায় খোকনের স্ত্রী মিনারা বেগম বাদী হয়ে এজাহারভুক্ত পাঁচজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে রিপন ও সোহেল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার ৯ দিন পরও গ্রেপ্তার হয়নি এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি সাহাবুদ্দিনসহ আরো আটজন। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ও পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে, সাহাবুদ্দিনের ছুরিকাঘাতেই হকার খোকন নিহত হন। নিহত খোকন ও ওই ঘটনায় আহত বাবুল চাঁদনীচকের সামনের ফুটপাতে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাবুল আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ। তাঁদের পাশে ব্যবসা করত সাহাবুদ্দিনসহ ঘটনায় জড়িতরা। তারা এক সময় একই গ্রুপে থাকলেও পরে আলাদা গ্রুপের হয়ে কাজ করত। ব্যবসায়ীদের ভয়ের কারণ জানতে চাইলে গতকাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, খুনিরা ধরা না পরায় তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, আদিপত্য, মাদক ব্যবসা আর চাঁদাবাজির বিরোধে আবারও খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সহযোগীরা এখনো মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে। বিশেষ করে খোকন মোল্লাকে ছুরি মেরে ভুরি বের করে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দেওয়া সেই সাহাবুদ্দিনের সহযোগীরা এখনো তত্পর। সরেজমিনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘খুনিদের ছেলেপেলেরা এখনো মার্কেটে আছে। ওরা রাজনৈতিক শেল্টারে চলাফেরা করছে। ’ 

এখনো আতঙ্কের ছাপ : গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিউ মার্কেট-সংলগ্ন চাঁদনীচক মার্কেটে ঢুকতেই চোখে পড়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। একটু জটলা দেখলে তারা সেখানে হস্তক্ষেপ করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। আশপাশে পুলিশের টহল থাকলেও মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীরা সার্বিক নিরাপত্তায় রয়েছেন। মার্কেটের তিন তলার যে সিজান  রেস্টুরেন্টের ভেতরে হকার  খোকন মোল্লাকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়, সেখানে এখনো রয়েছে ভীতির ছাপ। খুনের ঘটনার পর ক্রেতাও কমে গেছে বলে জানায় রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। হত্যাকাণ্ডের পর হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চাঁদনীচক মার্কেটের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এতে সাহাবুদ্দিনের হাতে রক্তমাখা ছুরি দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মার্কেটে চারটি গ্রুপ রয়েছে। তারাই অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে ফুটপাতের অবৈধ দোকানিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজির সম্পর্ক রয়েছে। তাদের ফুটপাতের মোড়ল বলে ঢাকা হয়। তাদের প্রত্যেকের আলাদা গ্রুপ আছে। ওই চারটি গ্রুপই ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ইয়াবার কারবার ও চাঁদাবাজি থেকে দৈনিক লাখ লাখ টাকা আদায় করে থাকে। তাদের আশ্রয়-প্রশয় দেওয়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এই এলাকায় অনেক প্রভাবশালী। তবে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের কারণে কোনো রাজনৈতিক নেতার নাম বলতে চাননি। এমনকি তাঁরা যখন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তখনো তাঁরা ভীত ছিলেন। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভাই দেইখেন পেপারে আমার নামটা দিয়ে দিয়েন না, তাহলে ওরা আমার ক্ষতি করবে। ওদের বিশ্বাস নেই, ওরা ভয়ংকর। ’


মন্তব্য