kalerkantho


এমপি লিটন হত্যা

মানসিক যন্ত্রণা থেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কাদের খান!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মানসিক যন্ত্রণা থেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কাদের খান!

ডা. কর্নেল (অব.) আব্দুল কাদের খান জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ২০০৮ সালে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হলেও পরে আর মনোনয়নই পাননি। ওই এলাকায় ভোটের হিসাবে তাঁর দলের অবস্থান শীর্ষ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ওই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। একপর্যায়ে রাজনৈতিক মাঠও চলে যায় লিটনের দখলে। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, এতে চরম হতাশায় পড়েন কাদের খান। ওই হতাশা থেকে নরঘাতকে পরিণত হন তিনি। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তিনি লিটনকে খুন করার পরিকল্পনা করেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করার পর থেকে খুনিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন কাদের। ৩১ ডিসেম্বর হত্যাকাণ্ডের দিনও তিনি মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। শুধু খুনিদের সঙ্গে নয়, আরো কয়েকজনের সঙ্গেও তিনি তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন।

লিটন খুন হলে যারা খুশি হবে বা তাঁর সঙ্গে যাদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে তাদের বেছে নেন কাদের। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া কাদের খানের জবানবন্দিতে এমন তথ্য রয়েছে বলে ওই সূত্রের দাবি।   

এদিকে কাদের খানের সম্পদ অনুসন্ধানে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুদকের উপপরিচালক বেনজির আহমেদ এ বিষয় অনুসন্ধান করবেন। অনুসন্ধানের তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন পরিচালক এ কে এম জাহিদ হোসেন খান।

গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শফিকুল ইসলাম শফি গতকাল সোমবার বলেন, খুনের পর হত্যাকারীদের নিজের গাড়িতে করে কাদের খান বগুড়ায় তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। পরে সুবিধামতো সময়ে তাদের ঢাকার বাসে তুলে দিয়ে নিরাপদে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।

জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কাদের খান রাজনৈতিক ঈর্ষা থেকে হমিসাইডাল (নরঘাতক) হয়ে পড়েন। তিনি ২০০৮ সালে সুন্দরগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই এলাকায় জাতীয় পার্টির ভোট বেশি। এরপর জামায়াত এবং তৃতীয় অবস্থানে আওয়ামী লীগ। বিগত নির্বাচনে লিটন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সেখানকার এমপি হন। এতে কাদের খানের রাজনৈতিক মাঠ বেদখলে চলে যায়। এলাকায় প্রভাবও কমে যায় তাঁর। এ কারণে তিনি হতাশায় পড়েন। লিটনকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিলেন না তিনি। তাঁকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেন তিনি। চিকিৎসক হওয়ায় নিজের ওই অবস্থা বুঝতে পেরেছেন তিনি। এই হতাশা থেকে মুক্তির জন্যই লিটনকে খুন করার পরিকল্পনা করেন কাদের খান।  

জেলা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ছয় মাসে কাদের খানের প্রায় ১০ হাজার ফোনালাপ ট্র্যাক করে পুলিশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছে। এর মাধ্যমে অনেকের পরিচয়ও পাওয়া গেছে, যা তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে এসব ফোনালাপ থেকে পুলিশ নিশ্চিত হতে পেরেছে কারা কিভাবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন সেসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।

সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ আতিয়ার রহমান বলেন, এমপি লিটন হত্যার পর নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা চারটি মামলায় ১১০ জনকে এবং হত্যা মামলায় ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হন কাদের খান ও তাঁর চার সহযোগী। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তারা জবানবন্দি দিয়েছে।

নজরদারিতে কাদের খানের বাড়ি : সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপড়হাটি খানপাড়া গ্রামে কাদের খানের বাড়িতে এখনো পুলিশের পাহারা আছে। কাউকেই সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে সুন্দরগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিপুলসংখ্যক উত্সুক মানুষ প্রতিদিন কাদের খানের বাড়ি দেখতে ভিড় জমাচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা কাদের খান সম্পর্কে নানা বিরূপ মন্তব্য ও ঘৃণা প্রকাশ করছে। সাবেক ছাত্রনেতা বিষ্ণুরাম রায় বলেন, এই নির্মম মানুষটিকে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে মহাজোটের সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী করা হয়েছিল। তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার পর সব কিছুই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।


মন্তব্য