kalerkantho


লালবাগে মিষ্টির দোকানে বিস্ফোরণ

বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন সাতজন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রিকশাচালক আবুল বাশার মাতব্বর (৪৫)। পুরো শরীরে দগদগে পোড়া ক্ষত।

৮০ শতাংশই পুড়ে গেছে শরীর। বাঁচার আশা দেখছেন না চিকিৎসকরা। এর পরও প্রাণান্ত চেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্বজনরাও আছে তাঁর কাছে। পোড়া যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আর্তচিত্কার করছেন। তাঁর আহাজারিতে উপস্থিত চিকিৎসকসহ অন্য রোগী ও স্বজনদের চোখে জল চলে আসে। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে পারছিল না।

শুধু বাশারই নন, আরো ছয়জন বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন। শনিবার বিকেলে লালবাগে একটি মিষ্টির দোকানে রহস্যজনকভাবে ফ্রিজের কমপ্রেসর বিস্ফোরণে তাঁরা আহত হয়েছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের গায়ে পোড়া দগদগে ক্ষত। চিকিৎসকরা বলছেন, কাউকে আশঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। দগ্ধদের মধ্যে দুজন মিষ্টির দোকানের কর্মচারী, দুজন রিকশাচালক, একজন রিকশাযাত্রী, একজন পথচারী এবং একজন পাশের দোকানের পনির বিক্রেতা। দুজনকে রাখা হয়েছে আইসিইউতে, একজনকে এইচডিইউতে এবং চারজনকে রাখা হয়েছে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে।

ঢামেক বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বার্ন ইউনিটে ভর্তি সাতজনের মধ্যে এই মুহূর্তে কাউকেই আশঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। এর পরও আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। ’

আহত রিকশাচালক আবুল বাশার জানান, শনিবার বিকেলে নাজিমউদ্দিন রোড জেলখানার ঢাল থেকে ৪০ টাকা ভাড়ায় দুজন যাত্রী নিয়ে রওনা হয়েছিলেন ইসলামবাগের উদ্দেশে। লালবাগ চৌরাস্তায় মিষ্টির দোকানের সামনে পৌঁছতেই বিকট শব্দ কানে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর গায়ে এসে পড়ে আগুনের দলা। এতে ঝলসে যায় তাঁর শরীর। এরপর কিভাবে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো আর মনে নেই তাঁর।

বাশারের বেডের পাশে বসে কাঁদছিলেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন বেগম। তিনি জানান, তাঁদের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গার মুনসিরাবাদ। তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। অভাব-অনটনের সংসার। তাই ছেলেমেয়েদের মুখে আহার তুলে দিতে তিন মাস আগে ঢাকায় চলে আসেন। লালবাগের শহীদনগরে ১০ নম্বর গলিতে থেকে রিকশা চালাতেন তিনি।

আরেক রিকশাচালক সোনাম উদ্দিন (৪৫)। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলির রামপাড়ায়। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় রিকশা চালান। রিকশা চালিয়ে তিনি দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে আবু বক্করকে এইচএসসি পাস করিয়েছেন আর ছোট ছেলে আবু সালেহ স্থানীয় স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র। মিষ্টির দোকান প্রাণ মিঠাইয়ের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া গ্রামের আইনুুল হকের ছেলে সবুজ (২০)। তিনি দুই বছর ধরে চাকরি করেন এই প্রতিষ্ঠানে। চাকরির পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

সবুজের মামা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে সবুজ সবার ছোট। গরিব মানুষ। কী দিয়ে চিকিৎসা করাবে তা জানি না। ’ একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সবুজের বন্ধু মারুফ (২০)। আগুনে তাঁর শরীরের ১৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

মারুফের মা মুক্তা বেগম জানান, তাঁর প্রথম স্বামী মুকুল হোসেন ছেলে সবুজকে দুই বছরের রেখে মারা যান। এরপর জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রায় দেড় বছর ধরে এই মিষ্টির দোকানে কাজ করেন মারুফ। চাকরির পাশাপাশি মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে মার্কেটিংয়ে অনার্স ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

দগ্ধ কলেজ ছাত্রী ফারহানা পান্না (২৫)। তাঁর শরীরের ২৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। পান্না বাসা থেকে বের হয়ে ছাপড়া মসজিদ এলাকায় বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন। লালবাগ চৌরাস্তায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি এ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। পান্না ধানমণ্ডি নিউ মডেল ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্রী। তাঁকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

সাব্বির আহমেদ লালবাগ চৌরাস্তায় পনিরের দোকানের মালিক। দুর্ঘটনার সময় বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। হঠাৎ বিকট শব্দে আগুন ও কাচের টুকরো এসে তাঁর ওপর পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝলসে যান তিনি। রিকশাযাত্রী মকবুল হোসেন। বাসা থেকে তিনি রিকশায় করে ইসলামবাগে একটি দোকানে যাচ্ছিলেন। আগুনে তাঁর শরীরের ১৮ শতাংশ ঝলসে গেছে।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামীম-উর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কী কারণে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তা বের করতে পুলিশ ও র‌্যাব চেষ্টা চালিয়ে আসছে। দোকান মালিক ও কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এটি নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা, এখনই তা বলা যাবে না। ’


মন্তব্য