kalerkantho


তামাকে সয়লাব তিস্তার চর

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘সারা দিন তামাকের কাম করায় হাতে কস নাগে। ভালো কার হাত ধুইলেও যায় না। ভাতের স্বাদ ‘তিতা’ নাগে। তয় কী আর করমো, প্যাটে খাইলে তো কাম করায় নাগবে। কয়দিন পরে তা আর তামাক থাইকপার নয়। ’

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরে তামাকের পাতা শুকানোর সময় এভাবেই বলছিলেন ইচলি চরের মোমেনা খাতুন। তাঁর মতো চরাঞ্চলের মানুষ চাষকৃত তামাকের পাতা উত্তোলনে ব্যস্ত সময় কাটছে। রংপুরে চলতি বছর ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আলু চাষ হলেও কমছে না ক্ষতিকর তামাকের আবাদ। বিকল্প ফসল উৎপাদনে বীজ প্রাপ্তিতে জটিলতা, উৎপাদন খরচ বেশি, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়াসহ সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় তামাক চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষকরা। এ ছাড়া তামাক চাষে ঋণ দিতে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় তামাকই ছিল রংপুর অঞ্চলের প্রধান ফসল।

তামাকসংশ্লিষ্ট দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে এখানকার ভার্জিনিয়া জাতের তামাকের কদর ছিল প্রচুর। তামাককে ঘিরে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দেশব্যাপী বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিনা পুঁজিতে তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। সে সময় বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দাসহ তামাকসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এ অঞ্চলে। এলাকার চাষিদের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সার্ভে অনুযায়ী ১৯০৮ সালে রংপুরের বুড়িরহাটে স্থাপিত হয় তামাক গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি সে সময় দেশের ভেতর এবং বিদেশ থেকে ১১৪টি তামাকের জাত সংগ্রহ করে। এ ছাড়া সুরভি ও সুগন্ধি নামক উচ্চ ফলনশীল দুটি জাতসহ নতুন নতুন তামাকের জাত উদ্ভাবন করে।

পরে তামাকের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এর চাষে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে চাষিদের। এর অংশ হিসেবে একসময় তামাক ক্রয়ের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টোব্যাকো কম্পানির (বিটিসি) রংপুর ডিপো বন্ধ হয়ে যায়। তামাক গবেষণা কেন্দ্রটি রূপ পাল্টে পরিণত হয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, সূর্যমুখী, সরিষা, বাদামসহ শাকসবজি চাষ করে চাষিরা যাতে তামাকের চেয়ে বেশি লাভ পেতে পারে সে বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পরও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষতিকর তামাকের চাষ।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর জেলায় এ বছর প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ অনেক বেশি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে ক্ষতিকর এই তামাকের চাষ হয়েছে গঙ্গাচড়া উপজেলায়। এ ছাড়া রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং কাউনিয়া উপজেলায় ব্যাপক তামাকের চাষ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সূত্র জানায়, বাপ-দাদার আমল থেকে তামাক চাষ করায় এর উৎপাদন কৌশল চাষিদের জানা। খুব সহজে বাড়িতে এর বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়। উৎপাদিত তামাক সংরক্ষণেও কোনো সমস্যা হয় না এবং অন্যান্য ফসলের তুলনায় দামও বেশি পাওয়া যায়। তা ছাড়া তামাকসংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলো ঋণদানসহ তামাক কেনার নিশ্চয়তা দেওয়ায় চাষিরা তামাক চাষ ছাড়ছে না।

সরেজমিন গঙ্গাচড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রবি মৌসুমের ফসল হিসেবে ব্যাপক এলাকায় আলু চাষ হলেও তামাক চাষে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। যেদিকে চোখ যায়, তামাক আর তামাক। বিশেষ করে তিস্তার বালুচর যেন তামাকের নিচে ঢাকা পড়েছে। চাষিদের ব্যস্ত সময় কাটছে তামাকের ক্ষেতে সেচ প্রদান, পাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে। লক্ষ্মিটারী ইউনিয়নের কলাগাছি, শংকরদহ ও ইচলি চরে যাওয়ার পথে মহিপুর ঘাটে নৌকায় ওঠার সময় মাঝিসহ স্থানীয় লোকজন প্রশ্ন করেন, তামাকের চর যাইমেন বাহে? অর্থাৎ তিস্তার চর যেন পরিণত হয়েছে তামাকের চরে।

কলাগাছি চরে তামাক চাষি আব্দুল লতিফ জানান, তামাক আবাদই তাদের একমাত্র ভরসা। সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন কখন তামাকের মৌসুম আসে। তামাকক্ষেতে কর্মরত একই এলাকার সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘বিকল্প ফসল হিসেবে আলু আবাদে অনেক টাকা লাগে। তা ছাড়া তামাক চাষ করলে ঋণও পাওয়া যায়। ’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন বিড়ি ফ্যাক্টরির তামাক ক্রয় এবং প্রসেসিং কেন্দ্রের আওয়ায় তিস্তার চরাঞ্চল ও গঙ্গাচড়ায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধসহ তামাক চাষে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী জানান, সরকার তো তামাক চাষ বন্ধ করেনি! চাষিরা যেখানে বেশি লাভ পাবে, সেখানেই যাবে। তবে ক্ষতিকর তামাক চাষে চাষিদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় তামাক চাষ ক্রমান্বয়ে কমে আসছে বলেও জানান তিনি।


মন্তব্য