kalerkantho


সিলেটে বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসব

মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে স্বপ্নের ‘আগামীর সিলেট’

সিলেট অফিস   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে স্বপ্নের ‘আগামীর সিলেট’

সিলেটে বেঙ্গল উৎসবের দ্বিতীয় দিন গতকাল সন্ধ্যায় লোকসংগীত পরিবেশন করেন ভজন বাউল। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে সুবিশাল সড়ক ধরে কিছুদূর এগোলেই রাস্তা দুই দিকে ভাগ হয়ে মূল সড়ক সুনামগঞ্জের দিকে আর অন্য সড়ক বাদাঘাটের দিকে চলে গেছে। দুই সড়ক যেখানে ভাগ হয়েছে ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু সবুজ টিলা। কাছে গেলে ভুল ভাঙবে। এটি মোটেও টিলা নয়, একটি মেগাশপ। এমনভাবে বানিয়ে তাতে ঘাস লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যে দূর থেকে দেখে যে কারো মনে হবে সত্যিকারের টিলা। রাস্তার দুই দিকে থাকা বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো পরিকল্পিত, গোছালো। দুই পাশে যে রাস্তা চলে গেছে, প্রতিটিই দুই লেনের, সড়ক বিভাজনেও গাছের সারি। যেন ইট-সুরকির মাঝেও সবুজের সরব উপস্থিতি। সব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো এক নগরের খণ্ডচিত্র এটি।

সিলেটে বেঙ্গল উৎসব চত্বরে সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চের ঠিক পাশেই বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশালাকার নান্দনিক কাঠামো। সেই কাঠামো পার হলেই দেখা মিলে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটলমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত স্থাপত্য প্রদর্শনী।

‘আগামীর সিলেট’ শিরোনামে এই প্রদর্শনীতে ঘুরতে গেলেই এমনটা দেখতে পাওয়া যায়। যেন হুট করে চোখের সামনে স্বপ্নের এক শহরের ক্যানভাস মেলে ধরে কেউ। যাঁরা একটি সুন্দর নগর প্রত্যাশা করেন, সুন্দর পরিচ্ছন দেশের স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের মাঝে মুহূর্তে এক ধরনের ভালোলাগার অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় এই আয়োজন।

প্রদর্শনী চত্বরে কথা হয় মুহম্মদ শাফায়াত হোসেনের সঙ্গে। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিষয়ে থিসিস করছেন। পাশাপাশি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আগামীর সিলেট পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, এই কাজ করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি করে দিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রস্তাব দেয় সিলেট সিটি করপোরেশন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আর্কিটেকচার ইনস্টিটিউট সে সময়ে পরিকল্পনাকে শুধু পযেন্টগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো নগরের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে; যেখানে সুরমা নদীর দুই তীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পুরো সিটি করপোরেশন এলাকাকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

চার কক্ষ নিয়ে চার ধাপে তুলে ধরা হয়েছে আগামীর সিলেটের রূপ। সেখানে চিহ্নিত করা হয়েছে সামনের সময়গুলোতে সিলেট কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাবনার বিষয়গুলো। সব মিলিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। তবে সিলেটের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেই পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

সিলেটের লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী স্থাপত্য প্রকৌশলী আহসান শওকত বললেন, পুরো পরিকল্পনা খুবই চমৎকার। নগরের সৌন্দর্যের বিষয়টির পাশাপাশি কোথায় নাট্যশালা হবে, কোথায় মিউজিয়াম হবে—সবই আছে পরিকল্পনায়। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে অন্য রকম এক নগর হিসেবে সিলেট ধরা দেবে সারা দেশে।

প্রদর্শনীতে যারাই আসছে তারাই মুগ্ধ হচ্ছে। আগ্রহ নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে বলেও জানালেন এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুব্রত দাশ। তিনি বললেন, সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। তারা বিভিন্ন বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝারও চেষ্টা করছে।

দশ দিনব্যাপী সিলেটে বেঙ্গল উৎসবে এ রকম নানা আয়োজন রয়েছে। সবখানেই মানুষের পদভারে মুখর। বিকেল ৪টা থেকে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও প্রতিদিন আগেই মানুষ চলে আসে উৎসবস্থলে। যারা আগে রেজিস্ট্রেশন করেনি তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ঢোকে উৎসবস্থলে।

গতকাল দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হাসন রাজা মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করতে ওঠেন খ্যাতিমান লোকসংগীতশিল্পী ভজন বাউল। তাঁর তাত্ত্বিক গানের মূর্ছনা সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে যেন ছড়িয়ে দিতে থাকে এক ধরনের বিষণ্নতা। উপস্থিত হাজারো শ্রোতা একাগ্র হয়ে শোনে চিরায়ত বাংলার লোকগান। সিলেটের খ্যাতিমান বাউল সাধক দূরবীন শাহের ‘নামাজ আমার হইল না আদায়’ গানটি যখন শুরু করেন তিনি তখন দর্শকদের মধ্যে আলাদা চাঞ্চল্য দেখা দেয়।

আজকের অনুষ্ঠানমালা : আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে শুরু হবে কালি ও কলম সাহিত্য সম্মেলন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হাসন রাজা মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সূচনা অধিবেশন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এর পরপরই এই মঞ্চে রাগাশ্রয়ী বাংলা গান পরিবেশন করবেন বর্ণালী চট্টোপাধ্যায়। এ ছাড়া নজরুলসংগীত ও সেকালের বাংলা গান পরিবেশন করবেন সুবীর নন্দী ও ঝুমা খন্দকার। সবশেষে রয়েছে জীবনমুখী গানের দল কৃষ্ণকলির পরিবেশনা।


মন্তব্য