kalerkantho


বালুখেকোদের থাবা যমুনেশ্বরীর বুকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বালুখেকোদের থাবা যমুনেশ্বরীর বুকে

রংপুরের মিঠাপুকুরে যমুনেশ্বরী নদী থেকে ‘বোমা’ মেশিনে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুরের মিঠাপুকুরে যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের হোতা হিসেবে ২০০৮ সালে সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন তরফসাদী গ্রামের আব্দুস সালাম। এর পরও কয়েকবার পত্রিকায় নাম এসেছিল তাঁর।

বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন কয়েক দফা পদক্ষেপও গ্রহণ করে। কিন্তু এখনো বন্ধ হয়নি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। শুধু আব্দুস সালামই নন, মিঠাপুকুরে যমুনেশ্বরী নদীর সাতটি পয়েন্টে এখন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রভাবশালী অন্তত ১৫ ব্যক্তি।

‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরে ভাঙন দেখা দেওয়া ছাড়াও ভারসাম্য হারাচ্ছে নদীর গতিপথ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিঠাপুকুরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সংস্কার ও নির্মাণ এবং পীরগঞ্জ উপজেলার ৫০ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়কের কাজে প্রচুর পরিমাণ বালু দরকার হচ্ছে। এরই সুযোগে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিক্রি করছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বড়বালা ইউনিয়নের আটপুনিয়া উত্তরপাড়া বাগানবাড়ী এলাকায় গত ছয় মাস ধরে নদীতে নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’ বসিয়ে বালু তুলছেন নুরু ইসলাম ও হুইয়াল ইসলাম। ওই গ্রামের নামাপাড়া এলাকায় বছরখানেক ধরে সাজু মিয়ার নেতৃত্বে বালু উত্তোলন করছেন কাওছার ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম।

মিলনপুর ইউনিয়নের তরফসাদী এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে আব্দুস সালাম, তাঁর ভাই আবুল কালাম ও আব্দুল জলিল বালু উত্তোলন করছেন। দুই বছর ধরে মুকিমপুর ভিটারচর এলাকায় জলাইডাঙ্গা গ্রামের শাহ্ আলম এবং ছয় মাস আগ থেকে গোপালপুর পায়রাদহ এলাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে বালু তোলা হচ্ছে।

এ ছাড়া বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নের চাঁনটারি এলাকায় হাফিজুর রহমান পচা মিয়া এবং বালুয়া আটপুনিয়ায় আমজাদ মেম্বার যমুনেশ্বরী থেকে বালু তুলছিলেন। তবে কিছুদিন ধরে তাঁরা বালু তোলা বন্ধ রেখেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আবার বালু উত্তোলনের জন্য এসব ব্যক্তি দেনদরবার করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে।

সাতটি পয়েন্টের মধ্যে আটপুনিয়া উত্তরপাড়া বাগানবাড়ী এলাকায় ‘বোমা মেশিনের’ মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের বালু তুলে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ওই গ্রামের নামাপাড়া এলাকায় এখনো চালু রয়েছে ‘বোমা মেশিন’। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ওই এলাকার বালু উত্তোলনকারী নুরু ইসলাম, হুইয়াল ইসলাম ও সাজু মিয়া জানান, এলাকায় মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। সেই কাজে বালু প্রয়োজন, তাই উত্তোলন করছেন তাঁরা।

মিলনপুর ইউনিয়নের তরফসাদী এলাকায় বিশেষ করে রাতেরবেলায় ‘বোমা মেশিনের’ সাহায্যে বালু উত্তোলন করে সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ট্রাক্টরের মাধ্যমে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বালু উত্তোলনকারী আব্দুস সালাম ও আবুল কালাম বলেন, মিলনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নুরুন্নাহার বেগম তাঁদের ভাতিজি। তাঁকে বলেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে তাঁদের এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন ইউপি সদস্য নুরুন্নাহার বেগম। তিনি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

মুকিমপুর ভিটারচর ও গোপালপুর পায়রাদহ এলাকায় বালু উত্তোলনকারী মিলনপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজার রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

মিলনপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আখিরুজ্জামান বলেন, ‘মুকিমপুর ভিটারচর ও গোপালপুর পায়রাদহ পয়েন্টে এখনো বালু উত্তোলন চলছে। আমি বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্যারকে অবগত করেছি। ’

মিলনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্যারের নির্দেশে কয়েকটি বালুর পয়েন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পরও এই অপকর্ম বন্ধ হচ্ছে না। ’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুমা আরেফিন বলেন, ‘সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন-অর-রশীদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে বালু উত্তোলনের কয়েকটি অবৈধ পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। প্রয়োজনে আবারও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ’


মন্তব্য