kalerkantho


বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট

ভিন্ন ভাষার বাতিঘর

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভিন্ন ভাষার বাতিঘর

বান্দরবান শহরে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটক। ছবি : কালের কণ্ঠ

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে সাতটি ভাষা শেখানো (পড়া, লেখা ও বলা) হয়। এগুলো হচ্ছে মারমা, বম, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, ত্রিপুরা ও খুমি। যেসব বাঙালি বা ভিন্নভাষী সরকারি-বেসরকারি কাজে আসে, তারা এখানে ভাষা শেখে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ভানরাম ঙুয়াম বম জানান, তিনি বম হলেও বান্দরবানে মারমা জনসংখ্যা বেশি। চাকরি পাওয়ার পর তিনি ভর্তি হন মারমা ভাষা শিক্ষা কোর্সে। পৃথক পৃথক কোর্সে অংশ নিয়ে এর কথ্য ও লিখিত রূপ ভালোভাবে রপ্ত করেন তিনি। সাবলীলভাবে মারমায় কথা বলতে পারায় শ্রেণিকক্ষে তিনি মারমা শিশুদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে রাঙামাটিতে যাত্রা শুরু এ ইনস্টিটিউটের। তখন এর নাম ছিল রাঙামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পরে এর উপকেন্দ্র হিসেবে বান্দরবানে কাজ শুরু হয়। তবে বর্তমানে এটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান।

এ ইনস্টিটিউটের ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের শুরু ১৯৯২ সালে, মারমা কোর্স চালুর মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি আয়োজন করে ‘প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় উপজাতীয় মাতৃভাষা প্রচলনের সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার। এর প্রায় ২০ বছর পর ২০১৭ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চালু করে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ক্ষদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও বর্ণমালার বই। ’ ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে বম প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হয়। ২০০০ সালে শুরু হয় ম্রো কোর্স। এর ১৪ বছর পর ২০১৪ সালে তঞ্চঙ্গ্যা এবং ২০১৬ সালে চাক ও ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু হয়। চলতি ফেব্রুয়ারিতে চালু করা হয় খুমি ভাষা শিক্ষা কোর্স। আগে এই ইনস্টিটিউটে কোর্সের ক্লাস নেওয়া হতো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অসুবিধা বিবেচনা করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীঅধ্যুষিত এলাকায় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীর অভাবে চাকমা ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া খেয়াংরা বর্ণমালা নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় চালু করা যায়নি কোর্স। লুসাই ও পাংখোয়া জনসংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এ দুটি ভাষার কোর্সও চালু করা যায়নি।

মারমা ভাষা শিক্ষা কোর্সে অংশ নিয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী অনেক সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি এবং কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অপরূপ চৌধুরী আগে বান্দরবান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। তখন তিনি মারমা ভাষা কথ্যরূপ কোর্সের একজন সফল শিক্ষার্থী ছিলেন।

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা উ চ নু মারমা জানান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ শত শত শিক্ষার্থী তাদের ভাষা শিক্ষা কোর্সে অংশ নিচ্ছে। নতুন ভাষা শিখে পাহাড়িদের সঙ্গে অনায়াসে কাজ করতে পারছে। অনেকে ফেসবুকে সে ভাষায় স্ট্যাটাস দিচ্ছে।

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক মং নু চিং জানান, গত বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি জনজাতির মধ্যে ১০টির নিজস্ব বর্ণমালা প্রদর্শন করা হয়। খেয়াং ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করা গেলে এ প্রতিষ্ঠানের চেষ্টার ষোলোকলা পূর্ণ হবে।


মন্তব্য