kalerkantho


‘হামাক না খ্যায়া মরা নাগিল হয়’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘বোরো আবাদে খরচ তো আগের চ্যায়া বেশি হইচে, ধানের ফির ঠিকমতন দাম পাওয়া যায় না। তয় বসি থাকলে তো চইলবার নয়, সময়মতন আবাদ না করলে হামরা কী খ্যায়া বাঁচমো।

’ বোরো ধানের চারা রোপণকালে এমন কথা বলেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের তালুক উপাসু গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক মধু মিয়া। রংপুর নগরের উত্তম হাজিরহাট এলাকার চাষি ইছাহাক আলী বলেন, ‘বোরোর আবাদ না করলে হামাক না খ্যায়া মরা নাগিল হয়। ’ সেচ খরচ বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বছর বছর লোকসান হলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই বোরো ধান চাষ করে রংপুর অঞ্চলের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা। তারা এই বোরো আবাদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে বিকল্প ফসল চাষ করার দিকেও ঝুঁকছে অনেক কৃষক।

ফলন ভালো হলেও অপেক্ষাকৃত উঁচু এই অঞ্চলের মাটিতে বোরো আবাদ সম্পূর্ণ সেচনির্ভর। শুকনো মৌসুমে বোরো আবাদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পড়ে। এসব দিক বিবেচনা করে ধীরে ধীরে বোরো আবাদ কমিয়ে বিকল্প লাভজনক ফসল চাষের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ করে আউশ আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই অঞ্চলের পাঁচ জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৯১ হাজার ৯৮৭ হেক্টর। আবাদ হয়েছিল পাঁচ লাখ এক হাজার ৯৬৪ হেক্টর। ২০১৫-১৬ সালে পাঁচ লাখ দুই হাজার ৫২৯ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বোরো আবাদ হয় পাঁচ লাখ ১১ হাজার ৬৮৬ হেক্টর। চলতি বছরে পাঁচ লাখ দুই হাজার ২৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারা রোপণ করা হয়েছে চার লাখ ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শত প্রতিকূল অবস্থায়ও সময়মতো বোরো ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত চাষিরা। রংপুর নগরের উত্তম হাজিরহাট এলাকার চাষি ইছাহাক আলী বলেন, ‘এবার দুই বিঘা জমিত চারা নাগাচু (লাগানো হয়েছে), আরো দুই বিঘা জমিত বোরো চাষের আশা আছিল। তয় পানির (সেচ খরচ) দাম বাড়ায় আর তা হবার নয়। ’ গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের দক্ষিণ কোলকোন্দ গ্রামের বর্গাচাষি আজিজার রহমান বলেন, ‘মোর নিজের কোনো জমি নাই। প্রতিবছর বর্গা নিয়া চার-পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করোং। এবার দেড় বিঘা জমিতে চারা নাগাচু। পানির (সেচ) দাম বাড়ার কথা শুনি বোরো আবাদের হাউস (শখ) মিটি গেইছে। ’ গত বছর বোরো চাষে সেচযন্ত্র মালিকরা প্রতি ঘণ্টা পানির দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা নিলেও এবার মৌসুমের শুরুতে নানা অজুহাতে ১০০ টাকা ঘণ্টায়ও পানি মিলছে না বলে জানান তিনি।

বোরো চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমি আবাদে এ বছর খরচ হবে কমপক্ষে ১১ হাজার ৩৫০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে গড় ফলন ১৮ মণ ধরা হলেও ৫০০ টাকা মণ ধরে এর মূল্য দাঁড়াবে ৯ হাজার টাকা। এতে প্রতি বিঘা জমির ধান উৎপাদনে দুই হাজার ৩৫০ টাকা লোকসান গুনতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক স ম আশরাফ আলী জানান, আগামী দিনে বোরো আবাদ কমিয়ে বিকল্প লাভজনক ফসল চাষের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিকল্প ফসল উৎপাদনে বিশেষ করে আউশ আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।


মন্তব্য