kalerkantho


কিশোরগঞ্জে কমছে আবাদ ধানি জমি কেটে পুকুর!

নাসরুল আনোয়ার ও শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০




কিশোরগঞ্জে কমছে আবাদ

ধানি জমি কেটে পুকুর!

অষ্টগ্রামের কলাপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক শিক্ষক আবদুল আহাদ একজন সম্পন্ন কৃষক। বড় হাওরে তাঁর প্রায় ১০০ একর বোরো জমি রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদের দিকটি তত্ত্বাবধান করেন তাঁর স্ত্রী হাজি মোর্শেদা তালুকদার। তিনি গতকাল রবিবার জানান, এবার তাঁদের প্রায় ৮০ একর জমিই পতিত রয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোর্শেদা তালুকদার জানান, তিন বছর ধরে হাওরে অকাল বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ঘটছে। কিছু জমির ফসল রক্ষা পেলেও হাওর থেকে সেই ফসল আনার রাস্তা নেই। এক একর জমির ফসল কাটতে দাওয়ালরা (ধান কাটার শ্রমিক) তিন-চার গুণ মজুরি নিয়েছে। এরপর কাটা ধানের মুড়ি বাড়ি আনতেও দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিতে হয়েছে। এমন চিত্র কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যান্য হাওর এলাকায় কমবেশি দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া জেলার উঁচু এলাকায় কোথাও কোথাও ধানি জমি কেটে পুকুর বানানো হচ্ছে লাভজনক মাছ চাষ করার জন্য। কিছু এলাকায় ধানের বদলে চাষ করা হছে গম-ভুট্টাসহ রবিশস্য।

এসব কারণে হাওরপ্রধান কিশোরগঞ্জ জেলায় কমছে বোরো আবাদ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক লাখ ৬৬ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবাদ হয় এক হাজার ৪১০ হেক্টর কম অর্থাৎ এক লাখ ৬৪ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে। আর চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রাই নির্ধারণ করা হয়েছে গত বছরের সমান। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আরেক তথ্যে বলা হচ্ছে, এ জেলায় ০.৮৭ শতাংশ হারে কমছে বোরোর আবাদ।

কৃষি বিভাগের খাতাপত্রে এমন হিসাব থাকলেও বাস্তবের চিত্র আরো খারাপ। কৃষকদের ভাষ্য, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়া, সেচের সংকট এবং সর্বোপরি উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বোরো আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছে তারা। তাদের আশঙ্কা, বোরোতে লাভের মুখ না দেখলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

এমন পরিস্থিতিতে খোদ কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেই ‘লোকসানি’ বোরো আবাদ ছেড়ে কৃষকদের ‘লাভজনক’ শাক-সবজিসহ রবিশস্য আবাদে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার পুরোটাই হাওর অধ্যুষিত এলাকা। বাকি ১০ উপজেলায়ও কমবেশি হাওর রয়েছে। হাওরের জমি বছরের ছয় থেকে সাত মাস পানিতে ডুবে থাকে। পানি সরে গেলে সেখানে বোরো চাষ করা হয়। তাই হাওরের কৃষকরা বোরো আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। অন্য এলাকার যেসব জমি দুই বা তিন ফসলি, সেসব এলাকায় বোরো চাষ কমে যাওয়ার চিত্র সহজেই চোখে পড়ে। অনেক এলাকায় বোরোর বদলে কৃষকরা ভুট্টা, গম, ডাল বা অন্য ফসল চাষ করছে। এমনকি মাছ চাষের আওতায় চলে যাচ্ছে বহু জমি। শুরু হয়েছে পুকুর খননের প্রতিযোগিতা।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কিশোরগঞ্জ-নিকলী সড়কের ডানে-বামে যত দূর দৃষ্টি যায় তত দূরই চোখে পড়ে মাছের খামার। তিন-চার বছর আগেও সেখানে ছিল বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। এসব জমিতে এখন আর ধান চাষ হয় না। সেখানে মাছের খামার বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।   

এক ইউনিয়নেই পাঁচ হাজার একর জমিতে মাছের খামার : জানা গেছে, লোকসানের কারণে কৃষিকাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে জমির মালিক বা কৃষকরা। মাছের খামারে তাদের জমিগুলো এখন ভাড়ায় খাটছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার এক দানাপাটুলি ইউনিয়নেই অন্তত পাঁচ হাজার একর জমিতে মাছের খামার করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ সদরের আরো বেশ কিছু এলাকায় এভাবেই ধানি জমি কেটে মাছের খামার করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে জানান। তিনি মনে করছেন, মাছ চাষও মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।

কৃষি বিভাগের হিসাব মতে ওই এলাকার আড়াই থেকে তিন হাজার একর জমি এরই মধ্যে চলে গেছে মাছের খামারে। কৃষকরা ধান চাষের চেয়ে খামারে জমি ভাড়া দিয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।

দানাপাটুলি ইউনিয়নের মাথিয়া, গাগলাইল, ব্রাহ্মণকান্দি, রহিমপুর, চাঁদেরহাসিসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকরা বলছে, বোরো চাষে লাভ নেই। লোকসানের বোঝা টানতে টানতে তারা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে বোরো জমিগুলো মাছের খামারে ভাড়া খাটাচ্ছে তারা। মাথিয়া গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম আঙুল উঁচিয়ে সামনের মাঠ দেখিয়ে বলেন, ‘এগুলো সব বোরো জমি। বছরে একটি মাত্র ফসলই হয়। কিন্তু এসব জমি এখন আর কৃষকের জন্য লাভজনক নয়। তাই সবাই তাদের জমি মাছচাষিদের কাছে ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। এক কানি জমি ভাড়া দিয়ে বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পাচ্ছি। আর একই জমিতে ধান চাষ করে ১০ হাজার টাকাও পাওয়া যায় না। ’

করিমগঞ্জ উপজেলার বড় হাওরে গিয়ে জয়কা গ্রামের কৃষক তাহের উদ্দিনের সঙ্গে দেখা। তিনি জানান, গত বোরো মৌসুমে তিনি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ দরে ধান বেচেছেন। এক মণ ধান ফলাতে যে টাকা খরচ হয়, মৌসুমের শুরুতে সেই দামে বেচা যায় না। সরকারিভাবে ধান কেনা হলেও সেটা মৌসুমের শুরুতে হয় না। পরিবারের খরচ, কৃষি শ্রমিকের মজুরি আর ঋণের টাকা শোধ করতে পানির দরে ধান বেচে দিতে হয় পাইকার বা মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের কাছে। গত মৌসুমে তিনি চার একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। লোকসানের কারণে এবার দুই একরের মতো জমিতে বোরো লাগিয়েছেন।

মিঠামইনের ঘাগড়া, চমকপুর, হোসেনপুর, অষ্টগ্রামের বড় হাওর ঘুরে দেখা গেছে, শত শত একর জমি পতিত। কৃষকরা জানায়, বিগত চার-পাঁচ বছর ধরেই এসব জমিতে চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে তারা বলে, ওই অঞ্চলের অন্তত ৩০-৩৫ হাজার একর জমি বরাবরই হাটুরিয়া ও কুশিয়ারা নদীর সেচের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক বছর ধরে সেচ মৌসুমে হাটুরিয়ায় পানি থাকে না। কুশিয়ারার একাংশও শুকিয়ে যায়।

করিমগঞ্জের মদন গ্রামের আবুল বাশার বলেন, ‘এইবার খালি খাওনের বুঝ বোরো করছি। ’ ইটনা বরিবাড়ি গ্রামের কৃষক আবদুল আহাদ জানান, কৃষিকাজ না করে কৃষক থাকতে পারে না। তাই লাভ-লোকসানের হিসাব না করে প্রতিবছরই বোরো আবাদ করে তারা।

করিমগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বোরোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ১১৫ হেক্টর। সে বছর বোরো আবাদ হয়েছে ৯ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়নি।

ইটনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জামাল উদ্দিন জানান, গত বছর ইটনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৭৪০ হেক্টর জমি। কিন্তু সে বছর তাঁরা সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেননি। এবার লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কম নির্ধারণ করায় তা অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমনে এবার ভালো দাম মিলেছে। সেই আশায় আবার মাঠে গেছে কৃষক।

মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাফিউল ইসলাম জানান, ঘাগড়া ও কেওয়ারজোরসহ কিছু এলাকায় সেচ সমস্যার কারণে বোরো চাষ বিঘ্নিত হয়। তবে গতবারের চেয়ে এবার কম জমি পতিত থাকবে। কৃষি বিভাগ কৃষকদের ভুট্টা, সরিষা, শাক-সবজিসহ রবি ফসলের দিকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।  

পাকুন্দিয়ার কৃষি কর্মকর্তা গৌর গোবিন্দ দাস জানান, তাঁর উপজেলায় গতবারের চেয়ে এবার বোরো আবাদ কিছুটা কম হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সারা জেলায় বোরো আবাদ ‘স্থিতিশীল’ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বলব না বোরো আবাদ বাড়ছে। তবে বাড়া-কমা যাই হচ্ছে তা খুবই সামান্য। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। বোরো চাষিদের উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ’ হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো জমিতে ভুট্টাসহ রবিশস্যে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।


মন্তব্য