kalerkantho


বিজয় সরকারের জন্মদিন আজ

ভক্তের তুলিতে শিল্পীর গান

নড়াইল প্রতিনিধি   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভক্তের তুলিতে শিল্পীর গান

শিল্পী বলদেব অধিকারীর বাড়ি কবিয়াল বিজয় সরকারের গানের চিত্র দিয়েই হয়ে উঠেছে ‘বিজয়ী গ্যালারি’। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘এই পৃথিবী যেমনি আছে, তেমনি পড়ে রবে/সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে...’, ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী/একদিন ভাবি নাই মনে...’, ‘তুমি জানো নারে প্রিয়/তুমি মোর জীবনের সাধনা...’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা চারণকবি বিজয় সরকারের ১১৫তম জন্মদিন আজ। ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের কাদায় মোড়ানো বিলপারের ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই কবিয়াল।

তাঁর মা হিমালয়া দেবী আর বাবা নবকৃষ্ণ অধিকারী।

বিজয় সরকারের প্রকৃত নাম বিজয় অধিকারী। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামের সঙ্গে ‘সরকার’ উপাধি যোগ হয়। তবে ভক্ত ও স্থানীয়দের কাছে ‘পাগল বিজয়’ হিসেবেই পরিচিত তিনি। ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পরলোকগমন করেন বিজয় সরকার। কেউটিয়ায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বিজয় সরকার এক হাজার ৮০০ কবি গান ও ভাব গান লিখে গেছেন। তাঁর প্রায় প্রতিটি গানই সাধারণ মানুষের মন জয় করে। তাঁর গান গ্রামবাংলার মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয়।

এ ছাড়া দেশের বাইরের বাংলাভাষীদের মধ্যেও তাঁর অসংখ্য ভক্ত রয়েছে। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন কবিয়াল বিজয় সরকার।

বিজয় সরকারের জন্মদিন উপলক্ষে কবির জন্মস্থান নড়াইলের ডুমদিতে আগামী ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সুরেন্দ্রনাথ অধিকারী ছিলেন কীর্তন দলের মৃদঙ্গবাদক। এ সুবাদে কবিয়াল বিজয় সরকারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। প্রায়ই তাঁর বাড়িতে এসে গান শোনাতেন তিনি। সুরেন্দ্রর ছেলে বলদেব অধিকারী ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতেন। ছোটবেলায়ই বিজয় সরকারের প্রতি বিশেষ ভালো লাগা জন্মে তাঁর। চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে না পারলেও তিনি ছবি ভালো আঁকতেন। তা দেখে বিজয় সরকার একদিন বলেছিলেন, ‘তুমি একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে। ’ একসময় বিজয় সরকারের গানকে চিত্ররূপ দেওয়া শুরু করেন বলদেব। বিজয় সরকারের প্রথম চিত্র আঁকার দাবি করেছেন এ শিল্পী। এমনকি ইউটিউবসহ গুগলে তাঁর আঁকা ছবি দিয়েই বিজয় সরকারের গান বোঝানো হয়। তবে গুগলসহ নানা জায়গায় তাঁর আঁকা বিজয় সরকারের ছবি প্রদর্শিত হলেও সেখানে তাঁর স্বাক্ষর বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ইতিমধ্যে বিজয় সরকারের অর্ধশত গানের ভাব নিয়ে ছবি এঁকেছেন বলদেব। তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে ইতিমধ্যে ছোট-বড় ১৭টি প্রদর্শনী হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিড়লা একাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচারের আয়োজনে চার দেশের শিল্পীদের (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, স্পেন) প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি স্থান পায়। গত ৮ থেকে ১৪ জানুয়ারি ঢাকার জয়নুল আর্ট গ্যালারিতে তাঁর ২৬টি চিত্রকর্ম নিয়ে একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নড়াইল সদরের মাইজপাড়া মধ্যপল্লীতে শিশুদের নিয়ে শিশুতীর্থ নামের একটি চিত্রাঙ্কন পাঠশালাও গড়ে তুলেছেন বলদেব। এখানে বিনা বেতনে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে ছবি আঁকা শেখানোর পাশাপাশি বিজয় সরকারকে জানার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ৩৫ বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি গ্রামবাংলা আর বিজয় সরকারের গান চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি নড়াইল শিল্পকলা একাডেমির চারুকলার শিক্ষকও। বলদেবের ভাষায়, ‘কবিয়াল বিজয় সরকারের গান মানুষকে মুগ্ধ করে। পাগল করে দেয়। তাঁর গান শুনে আমি বহুবার কেঁদেছি। তাঁকে অন্তরে ধারণ করতে চেয়েছি। মানুষ গান শোনে। সেই গান যদি দেখা যায়, তাহলে আবেগ আরো বেশি প্রকাশ পাবে। সেই ইচ্ছা থেকেই আমি বিজয় সরকারের গান আঁকি। ’

নিজে শিল্পের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে না পারলেও তাঁর একমাত্র ছেলে কান্তিদেব অধিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক। ছোট ভাই ড. সুশান্ত অধিকারীকে খুলনা চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ালেখা করিয়েছেন। তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।


মন্তব্য