kalerkantho


ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম বন্ধে ১২ সুপারিশ

দেড় বছর তদন্ত শেষে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন

নিখিল ভদ্র    

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছে। কর্মকর্তাদের অবহেলা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য, ঋণদানে যথাযথ বিধান অনুসরণ না করা, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া ও এসংক্রান্ত মামলা তদরকির অভাবকে এর জন্য দায়ী করেছে সংসদীয় তদন্ত কমিটি।

কমিটি এসব অনিয়ম বন্ধে ১২ দফা সুপারিশও করেছে।

দেড় বছর তদন্ত শেষে সম্প্রতি এসংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ওই কমিটি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম তদন্তে ২০১৫ সালের ২ জুলাই সংসদের অনুমিত হিসাব কমিটির বৈঠকে চার সদস্যের সাবকমিটি করা হয়। এর আহ্বায়ক হন ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, সদস্য হন আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, এ বি তাজুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সাবকমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও ছয়টি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর সুপারিশ চূড়ান্ত করে। ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট প্রথম এবং চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি সর্বশেষ বৈঠক হয়।

সুপারিশে বলা হয়েছে, সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ পুনঃ তফসিল কার্যক্রমের ভিত্তিতে প্রণীত মহাহিসাব নিরীক্ষকের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী অডিট আপত্তিগুলোতে জড়িত টাকার পরিমাণ, আপত্তিকৃত টাকা আদায় ও সমন্বয়কৃত অর্থের পরিমাণ এবং এ বিষয়ে মামলা বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও আদায়কৃত টাকার প্রমাণ যাচাই করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের জন্য পাঠানো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তদারকি ও পরিবীক্ষণ জোরদারে প্রকৃত তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন নিয়মিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠাতে বলা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা সঠিকভাবে প্রতিপালন না করে ঋণ বিতরণে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

আর পুনঃ তফসিলের কিস্তি আদায়ে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কিত প্রতিবেদন কমিটিতে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

সুপারিশে বলা হয়, ফৌজদারি এবং অর্থ ঋণ মামলা যথাযথভাবে তদারকি ও নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী, অগ্রণী ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। আর ঋণ প্রদান, পাওনা আদায়, সুদ আরোপ, গ্রাহকের শর্ত পালন না করা ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও জারি করা বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। পুনঃ তফসিল অনুযায়ী কিস্তি পরিশোধে কেউ ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী পাওনা আদায়ের জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়ে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রতি তিন মাস পর পর সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেকোনো অনুমোদিত ঋণের বিপরীতে টাকা দেওয়ার আগে জমি অথবা অন্যান্য সিকিউরিটি যথাযথভাবে ব্যাংকের নামে নিবন্ধন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিলের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হেড অফিসের তদারকি ও রেকর্ড রাখতে হবে। আরো বলা হয়েছে, বিভিন্ন দুর্নীতি ও অবহেলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহিষ্কার করা হয়। পরে তাঁদের আস্তে আস্তে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং অব্যাহতি দেওয়া হয়। এটা বন্ধ করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসান হওয়ার ফলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয় এবং সরকার (মালিক হিসেবে) জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ দিয়ে সে ঘাটতি পূরণ করে। এসব ঘাটতি পূরণের আগে যাতে অতীতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকের ব্যাড ডেবট্স অ্যান্ড ডাউটফুল ডেবট্স লোনের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় লোনগুলো অবলোপন করা হয়। একবার অবলোপন করা হলে এই সন্দেহজনক লোনগুলোর প্রতি আর নজর রাখা হয় না এবং ঋণগুলো অনাদায়ী থাকে। এ বিষয়গুলো তদারক করতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত কমিটি প্রথমে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংক নিয়ে কাজ শুরু করলেও পরে মূল কমিটির সিদ্ধান্তে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম খতিয়ে দেখেছে। এর আলোকে ১২ দফা সুপারিশ ছাড়াও তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।


মন্তব্য