kalerkantho


বগুড়ার সরকারি স্কুলটির ভবিষ্যৎ গণপূর্তের হাতে

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বগুড়ার সরকারি স্কুলটির

ভবিষ্যৎ গণপূর্তের হাতে

শীতের সকালে রোদে বসে সময় কাটানোর দৃশ্য এটি নয়। এটি বগুড়া শহরের লতিফপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য। অবাক করার বিষয় হলো—ভবন না থাকলেও সরকারি এই বিদ্যালয়টি ৪৩ বছরের পুরনো। পরিত্যক্ত স্কুল ভবন ভেঙে নতুন করে করার কথা থাকলেও আজও তা হয়নি। ছবি : কালের কণ্ঠ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনতাবিরোধী এক প্রভাবশালী অবাঙালির বাড়িটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টর্চার সেল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিহারি কলোনির সেই বাড়িটি ফেলে পালিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী অবাঙালি। স্বাধীনতার পর বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে পরিত্যক্ত ওই বাড়িতেই এলাকাবাসী প্রতিষ্ঠা করে ‘প্রীতি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পরে এটি সরকারীকরণ হয়।

অর্ধশত বছরের পুরনো বাড়িটির পলেস্তারা খসে পড়ছিল। বছর তিনেক আগে সেই ভবন ভেঙে নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি)। পুরনো মালামাল নিলামে বিক্রির পর নতুন ভবনের ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে বাধা এলো গণপূর্ত বিভাগ থেকে। জানা গেল, পরিত্যক্ত বাড়িটি সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। আটকে গেল নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ।

এরপর আড়াই বছর ধরে ওই বিদ্যালয়ে শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে কখনো পাশের ছোট ক্লাবঘরে, কখনো খোলা আকাশের নিচে। ৪৩ বছর পর জায়গা জটিলতায় সরকারি বিদ্যালয়টি এখন অস্তিত্ব সংকটে।

পাঠদানের পরিবেশ না থাকায় কমছে শিক্ষার্থী। আড়াই বছর আগে বিদ্যালয়ে আড়াই শ শিক্ষার্থী থাকলেও এখন তা ৫০-এ এসে ঠেকেছে। নিয়মিত উপস্থিতি গড়ে ২০ জন। এই অবস্থায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এলাকাবাসী বলছে, বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করে বিহারি কলোনির শ্রমজীবীদের সন্তান এবং ছিন্নমূল শিশুরা। বিদ্যালয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধের পথে। বিহারি কলোনির চা দোকানি জুয়েল মিয়ার মেয়ে মিম পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। ছেলে হৃদয় পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তারা দুজন জানায়, এভাবে গাদাগাদি করে বসে সব ক্লাসের একসঙ্গে পাঠদানে পড়া বুঝতে তাদের কষ্ট হয়। কিন্তু অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তির সামর্থ্য নেই তাদের বাবার। সেলুন শ্রমিক নাদিমের মেয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মেহজাবিন বলে, ছোট্ট ঘরে গরমের দিনে ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়। ক্লাবঘর ঘেঁষে বাড়ি আফসানা বেগমের। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের এ দুরবস্থার কারণে তাঁর মেয়ে সাবা ফারহানাকে এখান থেকে নিয়ে এবার পুলিশ লাইনস বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছেন।

প্রধান শিক্ষক নাছরীন বানু বলেন, বিদ্যালয়ের নানা সমস্যার কারণে দিনে দিনে শিক্ষার্থী কমছে। অভিভাবকরা সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করে দিচ্ছেন। বর্তমানে ছয়জন নারী শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের জন্য টয়লেটেরও ব্যবস্থা নেই। তাঁরা পাশের ক্লাবের টয়লেট ব্যবহার করেন।

প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক এস এম শাহাজাহান বলেন, জায়গা জটিলতায় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে কলোনির শ্রমজীবীদের সন্তানরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

জেলা প্রশাসনের নথি থেকে জানা গেছে, অবাঙালির পরিত্যক্ত বাড়িটিসহ ৩৬ শতাংশ সম্পত্তি স্বাধীনতার পর দেখভাল করার দায়িত্ব পায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সেই থেকে মাসিক ৩০ টাকা হারে ভাড়ার বিনিময়ে প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলে আসছে। ২০১৪ সালে নতুন ভবন নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে বাধাদানের পর বিষয়টি নিয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে; কিন্তু তাতেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ বিদ্যালয়ের ব্যাপারে সার্বিক প্রতিবেদনে রাজশাহীর তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেছিলেন, ‘নতুন ভবন নির্মাণের জন্য জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে ফেলায় শিক্ষার্থীরা খোলা আকাশের নিচে, ক্লাবঘরের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যেহেতু স্থানটি বর্তমানে খালি পড়ে রয়েছে, কোমলমতি শিশুদের পাঠদান অব্যাহত রাখতে ওই জায়গা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের অনুমতিদানের জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো। ’

বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, জমি, অর্থ—সব কিছুই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হতে হয়। প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের সময়ই গেজেট অনুযায়ী পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে জায়গাটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে হস্তান্তরিত হওয়ার কথা। এখন গণপূর্ত বিভাগের বাধার কারণে ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না। বিষয়টির দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রীতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গাটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে না জানিয়েই পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখন বিদ্যালয়ের নামে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র গৃহায়ণসচিবের। বিদ্যালয়ের জায়গা ছাড়া অবশিষ্ট জায়গাও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে আমি নিজেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখে এসেছি। জায়গাটুকু বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া হোক সেটা আমিও চাই। কিন্তু বরাদ্দের বিষয়টি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে জায়গাটির সার্বিক চিত্র চেয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছি। দ্রুত প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ’

এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন মিয়া বলেন, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দের ৪৮ লাখ টাকা আড়াই বছর ধরে পড়ে রয়েছে। জায়গা জটিলতার কারণে ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না।


মন্তব্য