kalerkantho


আইন অঙ্গনে বাংলা প্রচলন

আটকে আছে উদ্যোগের অভাবে

রেজাউল করিম   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আটকে আছে উদ্যোগের অভাবে

সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকারি উদ্যোগের অভাবে আইন অঙ্গনে বাংলা ভাষায় বিচারকাজ পরিচালনা ও রায় দেওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ইংরেজি ভাষায় বিচারকাজ ও রায়ের কারণে বিচার প্রার্থীদের অনেককেই ভোগান্তি পোহাতে হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিচার প্রার্থীদের এই ভোগান্তি দূর করতে আইন অঙ্গনে মাতৃভাষা বাস্তবায়নে সরকারকেই মূল উদ্যোগ নিতে হবে।

আদালতে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হলেও তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যাচাই-বাছাইয়ের নামে দুই বছর ধরে এ-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আটকে রয়েছে বিলটি।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাইকোর্টে বেশ কিছু বিচারক বাংলায় সুন্দরভাবে রায় দিচ্ছেন। যখন আমার কাছে বাংলায় রায়ের আপিল আসে, আমি সেগুলো দেখি। হাইকোর্টের কিছু কিছু বিচারক বাংলায় ভালো রায় দিতে পারেন। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের রায় বাংলায় ঘোষণা করতে আইনজীবীদের এগিয়ে আসা উচিত। আইনের বই বাংলায় লিখতে শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলন একটু কঠিন। কারণ ব্রিটিশদের দীর্ঘদিনের শাসনে এই উপমহাদেশের মানুষের মননে ও মানসে ইংরেজি এমনভাবে প্রোতিথ হয়েছে যে আমরা এখন ইংরেজিকে দেবতার ভাষার সমতুল্য দেখি। ব্রিটিশরা তাদের একক ও দীর্ঘ শাসব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে কথায় কথায় আইন করত। আইন হতো ইংরেজি ভাষায়, ম্যাজিস্ট্রেটরাও ছিলেন ব্রিটিশ। ফলে আদালতে ইংরেজি ভাষার প্রভাবটা বেশি পড়েছে। গত ৭০ বছরেও আমরা সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের ব্যর্থতা। এখন সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনে। এর বিকল্প নেই। শুধু উদ্যোগ নিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নে যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টিরও উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বিচারাঙ্গনের সঙ্গে জড়িত সবার মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। আইনগুলো বাংলায় অনুবাদ করার পাশাপাশি বিচারাঙ্গনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে। ’

আদালতে প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষা প্রচলন বাধ্যতামূলক করতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন (সংশোধন) বিল-২০১৪’ নামের একটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করেন পিরোজপুরের স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফরাজী। এ বিষয়ে গত শনিবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলা ভাষার ব্যাপক ব্যবহার ও প্রচলনের উদ্দেশ্যে ১৯৮৭ সালের মার্চে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন সংসদে পাস হয়। দেশের আদালতগুলোতে বিভিন্ন মামলার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে দেশের পল্লী তথা গ্রামীণ এলাকার অল্পশিক্ষিত মানুষ মামলার রায় বুঝতে না পেরে নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতে বিশেষ করে উচ্চ আদালতে বিচারকাজ পরিচালনা ও রায় বাংলা ভাষায় না হওয়ায় দেশের ৯৯ শতাংশ নাগরিক সেই বিচারকাজ ও রায় বুঝতে পারে না। সরকারকে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে বাংলা ভাষা প্রচলনে। আমি উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় বা আদেশ লেখার কথা বলেছি। আমার দীর্ঘ আইন পেশার জীবনে দেখেছি আমাদের দেশের আইনগুলো এখনো বাংলায় অনুবাদ হয়নি। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন আইনগুলো বাংলায় প্রণীত হয়েছে। আমার পেশা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় আইনের যথার্থ শব্দ চয়ন ও উপযুক্ত অর্থ না থাকায় অনেকে ইচ্ছা করলেও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে পারেন না। ’

দেশের উচ্চ আদালতসহ সব আদালতের বিচারকাজে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ প্রয়োগের বিষয়ে ২০১১ সালে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ আইন কমিশন। আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৮৭ সালের যে আইনটি রয়েছে তা অনুযায়ী বাংলা ভাষায়ই অফিস-আদালতের কার্যক্রম পরিচলিত হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয় না। এখন সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এই আইনটি কার্যকরের। এ জন্য সরকার কোনো আদেশ জারি করতে পারে। যে আদেশে ১৯৮৭ সালের আইন মেনে বিচারকাজ পরিচালনা ও রায় দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলা ভাষায় বিচারকাজ পরিচালনা ও রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে দরকার বিচারকদের মানসিকতার পরিবর্তন। অনেক বিচারপতিই বাংলায় অনেক আলোচিত রায় দিয়েছেন।


মন্তব্য