kalerkantho


বালুরাজ্যে কুমড়া বিপ্লব

তৌফিক মারুফ   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বালুরাজ্যে কুমড়া বিপ্লব

ধু ধু বালুচর। সাধারণ মাটির দেখা নেই চোখের নাগালে।

ঘাস নেই, গাছপালাও নেই। কাছাকাছি দূরত্বে পানিও নেই। এমন বালুর রাজ্যে খণ্ড খণ্ড সবুজের লতাপাতা গজিয়ে ওঠা দেখে চমকে যাওয়ার মতো ব্যাপার। হলুদ ফুলও হয়েছে কোনো কোনো ডগায়। মাটি কিংবা পানির নাগাল ছাড়া কী করে সম্ভব এমন বাগানের?

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বালুর ভেতর বিস্ময়কর এমন কুমড়া চাষের সাফল্য এসেছে একটি জুতসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগের হাত ধরে। দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে নদী অববাহিকায় কৃষি উতপাদন উন্নয়নে এক দশক আগে প্রথম গাইবান্ধা জেলার যমুনার চরের বালুতে ১৭৭ জন চাষি পিট পদ্ধতিতে ১১টি স্থানে কুমড়াসহ অন্যান্য সবজি চাষের প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রথম বছরেই ৬৩ হাজার কুমড়াসহ অন্যান্য সবজি উৎপন্ন হয়।

এমন সাফল্যের হাত ধরে বালুচরে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন দিন দিন বাড়তে থাকে। এক হিসাবে ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোট তিন হাজার ২৭৩ জন চাষি এক হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন কুমড়া উতপাদন করে, যার স্থানীয় বাজারমূল্য ২২ কোটি টাকা।

আর এভাবেই বালুচরে কুমড়া উতপাদনের এ পদ্ধতি ভূমিহীনদের কাছে আশার আলো হিসেবে দেখা দেয়। এ পদ্ধতির প্রয়োগ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ নামের একটি সংস্থা।

সংস্থাটির সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে সরকার ও ডিএফআইডির দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ‘ইইপি সিঁড়ি প্রকল্প’-এর মাধ্যমে কাজের গতি আরো বেড়ে যায়। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ ‘পাথওয়েজ ফ্রম পোভার্টি’ প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বশেষ ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৬ হাজার ৭০০ ভূমিহীন চাষির মাধ্যমে তিন হাজার চার হেক্টর বালুচর চাষের আওতায় আনা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুবাদে ৯১ হাজার ৭৯৯ মেট্রিক টন মিষ্টিকুমড়ার ফলন হয়, যার স্থানীয় বাজারমূল্য ৭১ কোটি টাকা (প্রতি কেজি আট টাকা দরে) এবং শহরের বাজারমূল্য ১৪৩ কোটি টাকা।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের এক্সট্রিম পোভার্টি প্রগ্রামের প্রধান এ জেড এম নাজমুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বালুতে কুমড়া ফলন পদ্ধতিটি এখন উত্তরাঞ্চল থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এই ফলন পদ্ধতির স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন পুরস্কারের মাধ্যমে।

গঙ্গাচড়ার কুমড়া চাষি সাইফুল হক বলেন, ‘আগে কল্পনাও করা যেত না এমন ধু ধু বালুর মধ্যে কোনো ফসল ফলানো যাবে; কিন্তু এখন সেই কল্পনাও আমরা সত্যি করছি। কোটি কোটি টাকার কুমড়া হচ্ছে। এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটছে। নারী-পুরুষ সবাই এ খাতে কাজ করছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা এ কাজে বেশি কাজের সুযোগ পাচ্ছে। সবাই স্বাবলম্বী হচ্ছে। ’

পদ্ধতি সম্পর্কে এ জেড এম নাজমুল ইসলাম চৌধুরী জানান, প্রথমে গভীর বালুর মধ্যে এক ঘনমিটার মাপের একটি করে গর্ত তৈরি করা হয়। এর মধ্যে বাইরে থেকে আনা ১২ থেকে ১৫ কেজি জৈব মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করা হয়, যার প্রতিটির ভেতর চারটি করে কুমড়ার বীজ বপন করে চাষিরা। চারা জন্মানোর পরপরই দুটি চারা রেখে বাকি দুটি সরিয়ে ফেলা হয়। সেই সঙ্গে এক মাস পর্যন্ত প্রতি তিন দিন অন্তর এক লিটার পরিমাণ পানি দেওয়া হয়। ফলন হওয়ার পরও কিছু অর্গানিক সার দেওয়া হয়। পরে স্বাভাবিক কিছু পরিচর্যার মাধ্যমে ৭০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে সব কুমড়া সংগ্রহ করে নেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে কোনোভাবেই রাসায়নিক কোনো সার বা কীটনাশকের দরকার হয় না।


মন্তব্য