kalerkantho


করমজল থেকে নিয়মিত চুরি হয় কুমিরের বাচ্চা!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



করমজল থেকে নিয়মিত

চুরি হয় কুমিরের বাচ্চা!

চিতা বিড়াল বিপন্ন প্রাণী। সুন্দরবনে আছে, তবে সংখ্যায় হাতে গোনা।

অথচ এ রকম একটি প্রাণীকেই হত্যা করেছে বন্য প্রাণী রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরা। বন বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করমজলে ১৯টি কুমিরের বাচ্চা হত্যার জন্য দায়ী ওই চিতা বিড়াল। তবে অভিযোগ উঠেছে, কুমিরের বাচ্চা ধারাবাহিকভাবে চুরি হওয়ার ঘটনা ধামাচাপা দিতে চিতা বিড়ালটি হত্যা করা হয়েছে।  

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী, পরিবেশকর্মী মাহফুজুর রহমান মুকুল কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯টি কুমিরের বাচ্চা হত্যা করেছে চিতা বিড়াল। তবে এ ঘটনার কয়েক দিন আগে যে ৪৩টি কুমিরের বাচ্চা উধাও হয়ে গেল, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকে নিয়মিত কুমিরের বাচ্চা চুরি হয়। এর সঙ্গে বন বিভাগের নানা পর্যায়ের সদস্য যুক্ত। তারা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চিতা বিড়ালের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে সেটিকে হত্যা করেছে।    

সম্প্রতি সরেজমিন সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজননকেন্দ্র পরিদর্শন করে জানা যায়, এখানকার প্যানে (কৃত্রিম পুকুর) ২৭৭টি কুমিরের বাচ্চা ছিল।

সেগুলোর বয়স কয়েক মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। চারটি প্যানে সেগুলো লালন-পালন করা হতো। প্রতিটি প্যান দুটি ধাপের। মাঝখানে গভীর এবং তাতে পানি থাকে। উপরিভাগ শুকনো। শুকনো জায়গায় খাবার দেওয়া হয়, সেখানে কুমির ছানাগুলো রোদও পোহায়। প্যানের ওপরে মোটা তারের জাল (লোহার নেট) দিয়ে আটকানো। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন কুমিরের বাচ্চা হিসাব করার কথা। কিন্তু এবার বেশ কিছুদিন পর হিসাব করা হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি প্রথম নজরে আসে বাচ্চা কমে গেছে। ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি দুই দফা হিসাব করে বলা হয়, কুমিরের বাচ্চা কমেছে ৪৩টি। এর পাঁচ দিনের মাথায় পাওয়া যায় কয়েকটি মৃত কুমির। পরের দিন ঘোষণা করা হয় ১৯টি কুমির মারা পড়েছে। ৫ জানুয়ারি সকালে প্যানে চিতা বিড়ালের আক্রমণ এবং সেটিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বলা হয়, আগের ১৯টি কুমিরের বাচ্চা ওই চিতা বিড়ালই মেরেছে।

যে চিতা বিড়ালটিকে কুমিরের বাচ্চা আক্রমণ ও হত্যার জন্য দায়ী বলা হচ্ছে, সেটি দৈর্ঘ্যে আড়াই ফুট। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মেহেদী জামান সাংবাদিকদের ঘটনার পরেই বলেছিলেন, ৪ ফেব্রুয়ারি ওই চিতা বিড়ালটি কুমিরের বাচ্চাগুলোকে মেরেছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, বন কর্তারা কিভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে ওই চিতা বিড়াল কুমিরের বাচ্চাগুলো মেরেছে? প্যানের ওপর লোহার যে প্রতিবন্ধক আছে তার ছিদ্রপথ গলিয়ে এই চিতা বিড়ালের প্রবেশ করা আবার নির্বিঘ্নে বাইরে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।   

করমজলে বিলুপ্তপ্রায় বা বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে লালন-পালন করা হয়। সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ২০০২ সালে এটি গড়ে তোলা হয়। এখানে বিলুপ্তপ্রায় নোনা জলের কুমিরের পাশাপাশি বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপও রয়েছে। সেখানে তিনটি বড় কুমির আছে। একটির নাম পিলপিল, অন্য দুটি রোমিও ও জুলিয়েট। পিলপিল ও জুলিয়েটই ডিম দেয়। সেই ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চা প্যানে বড় করে তোলা হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, তিন মাস আগে পিলপিল ৪৮টি এবং জুলিয়েট ৫০টি ডিম দেয়, ৮৫ দিন পরে তা থেকে বাচ্চা হয়। ২০০৫ সাল থেকে জুলিয়েট ডিম পাড়ছে। জুলিয়েট ও পিলপিল এ পর্যন্ত ৬২১টি ডিম দিয়েছে। তা থেকে বাচ্চা হয়েছে ৪৮২টি। এর মধ্যে ১০১টি কুমির বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং সুন্দরবনের নদী ও খালে ছাড়া হয়েছে।

বন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, এ কেন্দ্র থেকে কুমির, কচ্ছপসহ অন্যান্য প্রাণী নিয়মিতভাবে পাচার করা হচ্ছে। পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে বন বিভাগের কর্মী ও বিদেশি লোকজন জড়িত। অনেক বিদেশি পাচারকারী আছে, যারা গবেষণার কথা বলে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত। চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ ইউরোপের নানা দেশে কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি পণ্য এবং কুমিরের মাংস দামি খাবার হিসেবে ব্যবহূত হয়। আর চীনসহ একাধিক দেশে রয়েছে বন্য প্রাণীর বড় চোরাই বাজার। আন্তর্জাতিক চোরাই বাজারে কুমিরের দামও অনেক বেশি।  

একটি সূত্র মতে, করমজল বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজননকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তি পাচারের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। ৪৩টি কুমিরের বাচ্চা উধাও হওয়ার ঘটনায় ৩১ জানুয়ারি দাকোপ থানায় প্রথমে জিডি করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি একই থানায় কুমিরের বাচ্চা চুরি ও হত্যার অভিযোগে মামলা করা হয়। এতে আসামি করা হয় প্রজননকেন্দ্রের কর্মী জাকির হোসেন ও মাহবুব আলমকে। এরপর তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।  

কুমিরের বাচ্চা তদারকির কাজে নিয়োজিত দুই কর্মীর মধ্যে মাহবুব আলম বন বিভাগের লঞ্চের লস্কর এবং জাকির হোসেন করমজলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক কর্মকর্তা এম এ রবের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। কাজ করতে করতে তিনি কুমির লালনপালন সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়েছেন। করমজলে জাকিরের একটি দোকানও ছিল। কিছুদিন আগে দোকানটি তুলে দেওয়া হয়। এই নিয়ে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে জাকিরের বিরোধ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, দোকানের জন্য তৌহিদকে প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে দিতে হতো। একপর্যায়ে জাকির টাকা দিতে অস্বীকার করায় দোকানটি উচ্ছেদ করা হয়।

কুমিরের বাচ্চা নিখোঁজ ও মারা যাওয়ার ঘটনায় বন বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান ছিলেন চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. মেহেদী জামান। অন্যরা হলেন চাঁদপাই বন স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মো. আলাউদ্দিন ও করমজল বন্য প্রাণী প্রজননকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে কুমিরের মৃত্যুর জন্য চিতা বিড়ালকে দায়ী করেছে।

এ বিষয়ে করমজল স্টেশন কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল জাকির ও মাহবুব একে অন্যকে ফাঁসাতে কুমিরের বাচ্চাগুলোকে হত্যা বা পাচার করতে পারে। তাই ওই দুজনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জাকির ও মাহবুবের সঙ্গে সাবেক কর্মকর্তা রবের খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। কয়েক দিন আগে এম এ রব এখানে এসেছিলেন; তার পরই কুমিরের বাচ্চা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে।     

খুলনার দাকোপ থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, কুমিরের ৪৩টি বাচ্চা চুরির ঘটনায় দুজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। আর ১৯টি কুমিরের বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।

 


মন্তব্য