kalerkantho


চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

তদন্তে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে নানা অনিয়মের প্রমাণ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নগরের জামালখানে বেসরকারি চিটাগং আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ও বিজ্ঞান ল্যাব বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। অথচ ওই ল্যাবে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই।

সেই সঙ্গে লাইব্রেরিতেও বইয়ের সংখ্যা অতি নগণ্য। তিন হাজার টাকা করে উন্নয়ন ফি নেওয়া হলেও ভাড়া বাড়িতে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে।

কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ ছোট করে নির্মিত বাণিজ্যিক ভবন থেকে আয় হয় প্রতি মাসে এক লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক কল্যাণ পরিষদ থেকে খাতা, বই, পোশাক-পরিচ্ছদসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে হয়।

ন্যাশনাল ইংলিশ স্কুলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করায় বিভিন্ন খাতে বছরের বিভিন্ন সময়ে অর্থ আদায় করা হয়।

মির্জা আহম্মেদ ইস্পাহানি উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে ধার্য করা তিন হাজার টাকার সপক্ষে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি প্রমাণপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। কমিটির কার্যনির্বাহী সভায় এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যবিবরণী পাস হয়নি। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের থেকে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে মাসিক টিউশন ফি ও বেতন আদায় করা হচ্ছে।

হালিশহর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি স্কুলের অধ্যক্ষের কক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ করা হয়নি, যা সংবিধানের ৪(ক) ধারার অবমাননা।

এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতিও সংরক্ষণ হয়নি, যা আইনের লঙ্ঘন।

ইস্পাহানি আদর্শ হাই স্কুলে সেশন ফি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ১৬.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে তিন হাজার ৫০০ টাকা এবং মাসিক বেতন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।

শুধু চট্টগ্রাম নগরের মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি এসব স্কুলেই নয়, আরো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পেয়েছে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো। সম্প্রতি চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করতে গিয়ে বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম পায় তথ্য কমিটি।

অভিযোগ উঠেছে, স্কুলগুলো পরিচালনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই। যার যার ইচ্ছা মতো স্কুল পরিচালনা করছে। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই সমন্বয়হীনতা। সরকারিভাবে পরিদর্শক টিম স্কুলে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তারা না গিয়ে স্কুলের পক্ষে প্রতিবেদন দিয়ে দিচ্ছে। এতে বিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ভর্তিতে বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে অনেক বিদ্যালয়ের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভর্তিতে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে আরো বিভিন্ন অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার ঘটনা ধরা পড়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, ওই স্কুলগুলো এত দিন ঠিকভাবে মনিটর করা হয়নি। ’

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যে ৪৬টি স্কুলে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তাদের আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাড়তি টাকা শিক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’

ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পরিদর্শন তদারকি টিমে আমিও ছিলাম। দেখেছি, বেসরকারি মেরিট বাংলাদেশ, মেরনসান, কর্ণফুলী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত নিয়মিত হয় না। চান্দগাঁওয়ে রেসিডেনসিয়াল স্কুলে একটি ক্যাম্পাসের অনুমোদন থাকলেও তাদের আরো দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে। মেরিট বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে টাকা আদায় হলেও রেজিস্টারে তা নেই। ’

ক্যাব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ভর্তি বাণিজ্য তদন্ত করতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের তদারকি দল বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায়ের প্রমাণ পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও বিদ্যালয়গুলোর উদাসীনতাও প্রত্যক্ষ করে। শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্টদের তদারকি না থাকায় বিদ্যালয়গুলোতে শুধু ভর্তি বাণিজ্য নয়, আরো অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি দেখা গেছে। কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেপরোয়া হয়ে গেছে। ’

বিদ্যালয়গুলোতে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন ধরে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে সংযোগ কেটে দেন।


মন্তব্য