kalerkantho


বাস-কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষের পর আগুন

নিহতদের মধ্যে আটজন শনাক্ত পাঁচজনকে চেনা যাচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ ও নড়াইল প্রতিনিধি   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ফরিদপুরের নগরকান্দায় যাত্রীবাহী বাস ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষের পর আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আটজনকে শনাক্ত করা গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে ছয়জনের লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অশনাক্ত পাঁচজনসহ সাতজনের লাশ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে। অশনাক্ত পাঁচজনের পরিচয় জানতে প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ফরিদপুরের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) সুমন কুমার দাশ জানান, নিহতদের মধ্যে বাসযাত্রী গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর ইউনিয়নের নিজড়া গ্রামের গোলাম রসুল সিকদারের লাশ গতকাল দুপুরে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া সন্ধ্যায় আরো পাঁচজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা হলো নড়াইলের মনির হোসেন, শাজাহান মোল্লা, আলমগীর হোসেন, সামাদ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা। তাদের মধ্যে জুয়েল মোল্লা দুর্ঘটনাকবলিত হানিফ পরিবহনের বাসটির হেলপার। তার বাড়ি নড়াইল সদরের বাঁশগ্রাম ইউনিয়নে। আর বাসযাত্রী শাজাহানের বাড়ি নড়াইল সদরের কাগজীপাড়া গ্রামে।

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ মর্গে থাকা সাত লাশের দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তাঁরা হলেন হানিফ পরিবহনের বাসটির চালক নড়াইল সদরের বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের হেমায়েত মোল্লা ও কাভার্ড ভ্যানের চালক যশোরের বাহাদুরপুরের আসাদুজ্জামান আশা।

হেমায়েতের চাচা আকবর মোল্লা জানান, হেমায়েতকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর লাশ নেওয়া হবে।

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে নিহতদের ময়নাতদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কেউ যদি নিশ্চিত করে নিহত স্বজনকে শনাক্ত করতে পারে, তাহলে ময়নাতদন্তের পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. খবিরুল ইসলাম জানান, মর্গে পড়ে থাকা অশনাক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ময়নাতদন্ত করে এবং ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠাব। ’

ফরিদপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর জেলা প্রশাসন আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। মরদেহগুলো নিজ নিজ বাড়িতে নিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি মো. এজাজউদ্দিন জানান, চাকা পাংচার হওয়ায় হানিফ পরিবহনের বাসটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তখন বিপরীত দিক থেকে আসা কাভার্ড ভ্যানটির সঙ্গে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে গ্যাসচালিত কাভার্ড ভানটির সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে দুটি গাড়িতেই আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভালে বাস থেকে ১১টি এবং কাভার্ড ভ্যান থেকে দুটিসহ মোট ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় তাদের চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না।  

ওসি এজাজউদ্দিন জানান, থানার পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহায়তায় বাসের ৩৩ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে মুকসুদপুর এবং একজনকে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া আহত ১৫ জন নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের ১৪ জনের বাড়ি নড়াইলে।

নড়াইল সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহতরা হলো নড়াইল শহরের হাটবাড়িয়া এলাকার খালেক মিয়া ও তাঁর স্ত্রী শিরিনা খাতুন, নড়াইল শহরের মহিষখোলা এলাকার আল-আমিন, জহিরুল ও শরিফুল, নড়াইল পৌরসভার ডুমুরতলা এলাকার তমসির, শারমিন, দুর্গাপুর এলাকার আবিদ, সদর উপজেলার ফুলসর গ্রামের পিয়ারি, জঙ্গলগ্রামের মনিরুল, বাঁশগ্রামের জাহিদ শেখ, সিতারামপুরের সমর কবিরাজ, লোহাগড়া উপজেলার ব্রাহ্মণীনগর গ্রামের সুরুজ ও বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের সাব্বির। তাদের বেশির ভাগই বাস থেকে নিচে লফিয়ে নামতে গিয়ে আহত হয়। কয়েকজন অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। নড়াইলের সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিত্সক সুজল বকসী জানিয়েছেন, তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত।

দুর্ঘটনায় আহত নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিত্সা নেওয়া বাসযাত্রী নড়াইলের জাহিদুল ইসলাম (২৫) বলেন, ‘ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ ও ঝাঁকুনি খেয়ে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি, বাসের ভেতরে আগুন। তারপর কিভাবে বের হয়ে জীবন বাঁচাতে পেরেছি তা বলতে পারব না। কিছুই মনে নেই। মনে করতে পারছি না। ’

ওসি এজাজউদ্দিন আরো জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও কাভার্ড ভ্যান দুটি থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। কাভার্ড ভ্যানটি গোপালগঞ্জের পারভেজ ট্রান্সপোর্টের বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

ফায়ার সার্ভিসের ফরিদপুর স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ফরিদপুর, ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ ও মুকসুদপুর—এ চারটি স্টেশনের কর্মীরা আধাঘণ্টার চেষ্টায় গাড়ি দুটির আগুন নেভাতে সক্ষম হন। পরে অগ্নিদগ্ধ মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, গ্যাসচালিত কাভার্ড ভ্যানটির সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ায় আগুন লেগে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

নড়াইলে হানিফ পরিবহন সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে হানিফ পরিবহনের ওই বাসটি (ঢাকা মেট্রো-১৫-০-৩২৩) নড়াইল চৌরাস্তা কাউন্টার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এর মধ্যে নড়াইল চৌরাস্তা কাউন্টার থেকে ১৩ জন, রূপগঞ্জ বাজার থেকে আরো ছয়জন এবং লোহাগড়া থেকে ১৫ জন যাত্রী টিকিট কেটে ওঠে। এ ছাড়া কালনা ঘাটের ওপার গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থেকে আরো অন্তত ১০ জন যাত্রীসহ মোট ৪৫ জনের মতো যাত্রী নিয়ে ঢাকার পথে ছিল বাসটি।

গত শুক্রবার রাতে দুর্ঘটনার পর প্রথম উদ্ধারকারীদের একজন স্কুল শিক্ষক খালেদুর রহমান বাকী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘বাড়িতে ঘুমের আয়োজন করছিলাম। হঠাৎ পাশের সড়কে বিকট শব্দ ও ঘর্ষণের আওয়াজ শুনে বাইরে নামি। নিশ্চিত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। চিত্কার করে প্রতিবেশীদের সজাগ করে দৌড়ে গিয়ে দেখি, জ্বলন্ত বাস থেকে জানালার কাচ ভেঙে বাইরে আসার চেষ্টা করছে কয়েক যাত্রী। প্রাণপণ চেষ্টায় তাদের বের করার মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় আর এগোতে পারেনি। চোখের সামনে পুড়ে মানুষ মরতে দেখলাম। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। ’

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের গজারিয়া নামক স্থানে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষের পর আগুন লেগে অন্তত ১৩ জন মারা যায়।


মন্তব্য