kalerkantho


বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

সাগর-রুনির সেই বাসায় এখনো আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাগর-রুনির সেই বাসায় এখনো আতঙ্ক

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দাখিল এবং জড়িতদের বিচার দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন সাংবাদিকরা। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) উদ্যোগে সংগঠনটির চত্বরে আয়োজিত এই সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ ও বিচার ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। গত পাঁচ বছরেও এ হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা না হওয়ায় তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিহতদের স্মরণে সমাবেশের শুরুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এদিকে পশ্চিম রাজাবাজারে হত্যাকাণ্ডের সেই ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বাসাটিতে আট মাস ধরে নতুন ভাড়াটিয়া থাকছে। তবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে এই ভাড়াটিয়াও বাড়ি ছাড়তে চাইছে। দেড় মাস আগে ওই বাড়িতে হানা দেয় ডাকাতদল। সাগর-রুনি হত্যার আগেও সেখানে চুরির ঘটনা ঘটে। বাড়ির বাসিন্দারা বলছে, তারা এখনো সাগর-রুনির ঘটনা ভুলতে পারছে না। সম্প্রতি র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা বাড়িতে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গতকাল নড়াইলে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সাগর-রুনির হত্যা মামলা শিগগিরই আলোর মুখ দেখবে।

১১ মার্চও সমাবেশের ডাক : গতকাল সাগর-রুনি হত্যার পাঁচ বছর উপলক্ষে ডিআরইউ আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেন জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) দুই অংশ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) দুই অংশ, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ (ক্র্যাব) বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সমাবেশ থেকে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে এক যৌথ সভা আহ্বান করা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও বিচার দাবিতে ১১ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সড়ক অবরোধ ও প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।

সমাবেশে বিএফইউজে মহাসচিব ওমর ফারুক বলেন, সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চলছে। সর্বশেষ শিমুলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু শিমুল হত্যায় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ডিইউজের সভাপতি শাবান মাহমুদ বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের কথা বলে সেই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এখনো এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। ’ ডিআরইউ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা বলেন, ২২ ফেব্রুয়ারির যৌথ সভা থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ সারা দেশে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন বন্ধের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

প্রতিবাদ সমাবেশে সাগর-রুনির একমাত্র ছেলে মাহীর সরওয়ার মেঘ এবং রুনির ভাই নওশের আলম রোমান অংশ নেন। সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে রোমান বলেন, ‘আমার বোন ও ভগ্নিপতির হত্যার বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছি। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন ধামাচাপা পড়ে গেছে। ’

প্রতিবাদ সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ, রুহুল আমিন গাজী, আব্দুল জলিল ভূইয়া, ইলিয়াস খান, সৈয়দ আবদাল আহমদ প্রমুখ।

স্বজনরা জানায়, গতকাল সকালে মেঘসহ পরিবারের সদস্যরা আজিমপুর কবরস্থানে সাগর-রুনির কবর জিয়ারত করতে যান। বিকেলে রাজাবাজারে রুনির মায়ের বাসায় এক দোয়া ও মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়।

সেই বাড়িতে এখনো আতঙ্ক : ৫৮/এ/২ পশ্চিম রাজাবাজার, শাহজালাল রশিদ লজ—এই ভবনের পঞ্চম তলার ভাড়া বাসায় খুন হয়েছিলেন সাগর-রুনি। পাঁচ বছর পর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, সেখানে এখনো রয়েছে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক। দেখা যায়, পঞ্চম তলায় ভাড়া উঠেছেন এক দম্পতি। ওই বাসার গৃহকর্তা আবু ইউসুফ অভি কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। গত বছরের জুন মাসে ফ্ল্যাট মালিক সাজ্জাদ হোসেন তাঁকে বাসা ভাড়া দেন। গত মাসেও র‌্যাবের লোকজন এসে বাড়ির লোকজনের কাছে খবর নিয়ে গেছে। অভি দাবি করেন, তাঁরা দুজন বেশি ভাড়ার বাসা নিয়ে থাকছেন। তাই বাসাটি ছেড়ে দেবেন তাঁরা।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভাড়াটিয়া বলেন, ‘সাগর-রুনি খুনের আগেও এই বাড়িতে চুরি হয়েছে। জোড়া খুনের পর অনেক ভাড়াটিয়া চলে গেছে। এখন আবার ডাকাত হানা দিয়েছে। এই এলাকার কোনো চক্র থাকতে পারে, যারা বাড়িটিকে ক্লোজলি মনিটর করছে। এই সূত্রে তদন্ত করলে কিছু হয়তো বেরোতেও পারে। ’ ওই ভাড়াটিয়া আরো বলেন, ‘দেড় বছর আগে র‌্যাব বাসাটির তালা খুলে মালিককে বুঝিয়ে দেয়। এরপর ওই বাসাটি বেশ কিছুদিন খালি ছিল। যাঁরা উঠেছেন তাঁরাও নাকি চলে যাবেন—এমনটাই শুনছি। ’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য : আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি জানান, গতকাল দুপুর ১টার দিকে নড়াইলের নড়াগাতি থানার অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ সময় তিনি বলেছেন, ‘সাগর-রুনি হত্যা মামলা অতিশীঘ্রই আলোর মুখ দেখবে। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাব ঘটনাটি তদন্ত করছে। দুজনের ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়া গেছে। তা ম্যাচিংয়ের চেষ্টা চলছে। ’

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার তদন্ত নানা ডালপালা মেললেও রহস্যের কিনারা হয়নি। সর্বশেষ গত বুধবার আদালত আগামী ২১ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।


মন্তব্য