kalerkantho


স্বত্ব নিবন্ধনের অভাবে নকল হচ্ছে সাহিত্যকর্ম, প্রতারিত লেখকরা

রেজাউল করিম   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বত্ব নিবন্ধনের অভাবে নকল হচ্ছে সাহিত্যকর্ম, প্রতারিত লেখকরা

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব নজরুল ইসলামের লেখা ‘ছোটদের শেখ হাসিনা’ বইটি প্রকাশিত হয় গত বছর। বইটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনী ও কর্ম তুলে ধরেছেন লেখক—ছোটরা যাতে সহজেই প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে জানতে পারে।

এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একই নামে প্রায় হুবহু আরেকটি বই এসেছে। বইটি প্রকাশ করেছে জনতা প্রকাশনী।

লেখক নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমার লেখা বইটি প্রকাশের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে তিনবার পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করেন। বইটি এখনো বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রকাশনী সংস্থা ‘জিনিয়াস প্রকাশনী’। অথচ চলতি বইমেলায় একই নামে প্রায় হুবহু অন্য একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটি এ বছর প্রকাশিত হলেও আইএসবিএন নম্বর নেওয়া হয়েছে ২০০৭ সালের। নকল বইটির বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায় ভাবছি। ” নজরুল ইসলাম গত সোমবার জানান, তাঁর লেখা বইটির জন্য গত বছরের আইএসবিএন নম্বর নেওয়া হলেও কপিরাইট নিবন্ধন করা হয়নি।

শুধু নজরুল ইসলাম নন, অনেক লেখকের বই-ই অন্যজনের নামে বাজারজাতের অভিযোগ রয়েছে।

আর লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্য ভাষায় গ্রন্থ অনুবাদের ঘটনা ঘটছে অহরহ। কোনো বিশেষ লেখা, কবিতা, উপন্যাস, নাটক থেকে আংশিক চুরি করে অন্য একটি গ্রন্থ, কবিতা বা নাটক তৈরির অভিযোগও কম নয়। ফলে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সাতিহ্যকর্মের লেখক।

দেশের অন্যতম কবি অসীম সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে কপিরাইট আইন থাকার তথ্যই অনেকে জানে না। ফলে লেখা বা গ্রন্থ কপিরাইট আইনে নিবন্ধনটাও তাদের কাছে অবান্তর। আবার স্বত্ব চুরি করাটা আমাদের দেশে একটি সাধারণ ব্যাধি। এটি ঠেকাতে কপিরাইট আইন প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকর উদ্যোগ নেই। ” তিনি বলেন, ‘কপিরাইট অফিস বলে থাকে যে লেখককে তাঁর স্বত্ব সংরক্ষণের জন্য আবেদন করতে হবে। সেটি ঠিক আছে। কিন্তু স্বত্ব চুরি ঠেকাতে এবং কপিরাইট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে। ’

অসীম সাহা বলেন, একটি গ্রন্থের স্বত্ব যখন কপিরাইট নিবন্ধিত হয়, তখন প্রকাশককে লেখকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়। নিবন্ধন না থাকলে প্রকাশক ইচ্ছা মতো কোনো গ্রন্থ প্রকাশ করতে পারেন। এভাবে তাঁরা বেশির ভাগ সময় লেখককে তাঁর রয়ালটি থেকে বঞ্চিত করেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী একজন লেখককে তাঁর প্রকাশকের সঙ্গে অবশ্যই লিখিত চুক্তি করতে হবে এবং তাঁর স্বত্ব কপিরাইট নিবন্ধিত হতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বড় লেখকরা তাঁদের লেখার জন্য বড় ধরনের রয়ালটি পান। ফলে তাঁরা কপিরাইট বা স্বত্ব অধিকার নিয়ে মুখ খোলেন না। কিন্তু মাঝারি বা ছোট লেখকরা কপিরাইট না থাকায় বরাবরই বঞ্চিত হন। অনেক সময়ই তাঁরা প্রকাশকের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত ব্যবহার পেয়ে থাকেন। ’

বাংলাদেশ কপিরাইট কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জাফর আর চৌধুরী বলেন, ‘কপিরাইট আইন-২০০৬ অনুযায়ী কোনো সাহিত্যকর্ম কপিরাইট নিবন্ধিত করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে উন্নত বিশ্বে কপিরাইট করা বাধ্যতামূলক। কপিরাইট নিবন্ধন করলে লেখকই সহজেই পাইরেসিমূলক যেকোনো সমস্যার প্রতিকার পাবেন। অন্যথায় তিনি নানা সমস্যার মুখে পড়তে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের লেখকরা এখনো এ বিষয়ে সচেতন নন। ফলে অহরহ এ রকম সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ’

বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তিন হাজার ৪৪৪টি নতুন বই। তার আগের বছর বেরিয়েছে তিন হাজার ৭০০টি নতুন বই। ২০১৪ সালে বেরিয়েছিল দুই হাজার ৯৫৯টি আর ২০১৩ সালে তিন হাজার ৭০টি।

জাফর আর চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, শুধু একুশে গ্রন্থমেলায়ই প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার করে নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ কপিরাইট নিবন্ধনের পরিমাণ একেবারেই হাতে গোনা। ফলে লেখকরা তাঁদের গ্রন্থস্বত্বের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কপিরাইট কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ পর্যন্ত মাত্র ১১৩টি সাহিত্যকর্ম কপিরাইট নিবন্ধিত হয়েছে। আগের পুরো বছরে সংখ্যাটা মাত্র ২৩৬। তার আগের বছরে আরো কম, মাত্র ১৭৫টি সাহিত্যকর্ম নিবন্ধিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে পাণ্ডুলিপি, প্রকাশিত বই, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা ইত্যাদি।

আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণি এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, একজন লেখক যত দিন বেঁচে থাকেন তাঁর লেখার স্বত্বের ওপর কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আর স্বত্ব সংরক্ষণে একটি আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেটি অনুসরণ না করলেও চলে। লেখক মারা যাওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা চাইলে কপিরাইট নিবন্ধন করতে পারেন এবং সাধারণত সেটিই হয়।

অকার্যকর টাস্কফোর্স : কপিরাইট প্রতিরোধে ১৬ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয় ২০১৪ সালের মে মাসে। এই কমিটির জন্য ভিন্ন কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। কোনো লজিস্টিক সাপোর্টও নেই। ফলে শুরু থেকেই এটি অকার্যকর হয়ে আছে।

কপিরাইট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, টাস্কফোর্স যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি অভিযান পরিচালনা করেছে।

একুশে গ্রন্থমেলায় নিবন্ধন হচ্ছে : চলতি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় যেকোনো ধরনের সাহিত্যকর্মের স্বত্ব নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছে কপিরাইট কার্যালয়। এ জন্য তারা একটি স্টল নিয়েছে।


মন্তব্য