kalerkantho


বিজিএমইএ ভবন ভাঙা ঠেকাতে চলছে তদবির

এম বদি-উজ-জামান ও এম সায়েম টিপু   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিজিএমইএ ভবন ভাঙা

ঠেকাতে চলছে তদবির

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দাখিল করা রিভিউ আবেদনে আটকে গেছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ভবন ভাঙার সব প্রক্রিয়া। ভবনটি যেন না ভাঙতে হয় এ জন্য তারা আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারের কাছে তদবির চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ জন্য বিজিএমইএর সাবেক দুই নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে।

উচ্চ আদালতের রায়ে বিজিএমইএ ভবনটিকে ‘হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো’ উল্লেখ করা হয়েছিল। এ অবস্থায় ভবন রক্ষার কৌশল খুঁজছেন বিজিএমইএ নেতারা।

বিজিএমইএ ভবন ভাঙার বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, আপিল বিভাগ ওই ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এ রায় পুনর্বিবেচনার জন্য বিজিএমইএ রিভিউ আবেদন দাখিল করেছে। এটা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আপিল বিভাগ কী সিদ্ধান্ত দেন সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে আপিল বিভাগ তাঁর রায় বদলাবেন এমনটি মনে হয় না। আপিল বিভাগ আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে বিজিএমইএ ভবন ভাঙতেই হবে।

পরিবেশবিদ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি শুনেছিলাম রাজউক চেয়ারম্যান বলেছেন, ২৮ জানুয়ারির পর এ ভবন ভাঙার প্রস্তুতি আছে। এ অবস্থায় শিগগিরই ভবনটি ভাঙার বিষয়ে তাঁরা পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করি। ’ 

বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিভিউ আবেদন করেছি। আমরা আশাবাদী যে আদালত পুরো বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন। আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। এ ছাড়া ভবন ভাঙতে হলে রায়ের নির্দেশনা অনুসারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বিজিএমইএ ইতিমধ্যে সরকারের কাছে জমি চেয়েছে। জমি বরাদ্দ পেলে নতুন ভবনের জন্য আমরা কাজ শুরু করে দেব। আর ভবনের অন্য সদস্যের ব্যাপারে আদালতের রায় অনুসারে সিদ্ধান্ত নিবে বিজিএমইএ। ’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল প্রকল্পের বেগুনবাড়ী খালের একেবারে মধ্যভাগে গড়ে তোলা হয়েছে সুউচ্চ ভবন। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর এ ভবন ভেঙে ফেলতে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার জন্য তারা গত ৮ ডিসেম্বর রিভিউ আবেদন করে। এ আবেদন এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এ আবেদনের ওপর ঠিক কবে শুনানি হবে তা কেউ বলতে পারছে না। শুনানির বিষয়টি নির্ভর করছে আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ওপর। এ আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিজিএমইএ ভবন ভাঙার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সরকারি দপ্তরে থেকেও একই কথা বলা হচ্ছে।

বিজিএমইএ ভবন ভাঙার নির্দেশসংবলিত আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএকে নিজ খরচে ভবনটি ভাঙতে হবে। বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে ব্যর্থ হলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউক ভবনটি অপসারণ করবে। এ জন্য বিজিএমইএর কাছ থেকে খরচ নেবে। এ ছাড়া এ ভবনে যাঁরা ফ্ল্যাট কিনেছেন তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়াসহ হাইকোর্টের দেওয়া অন্যান্য নির্দেশনা বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আদালতে বিজিএমইএর করা আপিলের রিভিউর (পর্যালোচনা) সময় তিন মাস পর্যন্ত তাঁরা অপেক্ষা করবেন। এরপর ভবন ভাঙার ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা অনুসারে উদ্যোগ নেবে রাউজক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিভিউ আবেদনে রায় আমাদের পক্ষে আসবে, এ ব্যাপারে খুব আশাবাদী। আর একান্তই যদি ভাঙতে হয়, এ জন্য অন্য জায়গায় যেতে আদালত সম্মানজনক সময় দেবেন বলে বিশ্বাস করি। ’

বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলতে হলে যাঁরা এ ভবনে বিনিয়োগ করেছেন, ফ্ল্যাট কিনেছেন, তাঁদের কী করা হবে সে বিষয়ে এখনো বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের কিছুই জানানো হয়নি। এ বিষয়ে ভবনের সপ্তম তলায় ক্লিফটন গ্রুপের একজন প্রতিনিধি আবু বকর সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিজিএমইএ এখনো আমাদের কিছু বলছে না। ভবন ভাঙলে কী হবে সে বিষয়েও কিছু বলছে না। আমরা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। ’

বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল প্রকল্পের বেগুনবাড়ী খালের একেবারে মধ্যভাগে গড়ে তোলা সুউচ্চ ভবনটির চারটি ফ্লোর রয়েছে বিজিএমইএর দখলে।

বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালের ২ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডি এইচ এম মনির উদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। পরদিন ৩ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) রুল জারি করেন। এ রুলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় দেন। হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ভবনটি রায় প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলতে সরকারকে নির্দেশ দেন। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এ রায়ের কপি পাওয়ার পর আপিল বিভাগে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে আপিল করার অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে এ আবেদন গত বছরের ২ জুন খারিজ করেন আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছরের ৮ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। এ রায়েও ৯০ দিনের মধ্যে ভবন ভাঙতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তবে রায়ের কপি পাওয়ার পর গত ৮ ডিসেম্বর বিজিএমইএ রিভিউ আবেদন দাখিল করে। এ রিভিউ আবেদন এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

 


মন্তব্য