kalerkantho


শিশু শুভ হত্যাকাণ্ড

চাপে আপস করতে বাধ্য হয়েছেন বাবা

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চাপে আপস করতে

বাধ্য হয়েছেন বাবা

গত বছরের ৩১ মার্চ কেরানীগঞ্জে মায়ের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিহত শিশু শুভর পরিবারের আহাজারি আজও থামেনি। ছবি : ফাইল ছবি

মায়ের হাত ধরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন দেখতে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শুভ কাজী। তবে আর বাড়ি ফেরা হয়নি।

কেন্দ্র দখলের জন্য স্থানীয় সন্ত্রাসী রানা মোল্লার নেতৃত্বে তার বাহিনীর চালানো এলোপাতাড়ি গুলিতে মারা যায় সে। গত বছরের ৩১ মার্চ ইউপি নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানার মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও আজও চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার শুরু হয়নি।

শুভদের বাড়ি কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের ঢালীকান্দি গ্রামে। এই হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছিল। প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হয়। পরে রানা মোল্লাকে প্রধান আসামি করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে শুভর বাবা হালিম কাজী আদালতে মামলা করেন। জানা গেল, মামলার প্রায় এক বছর হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। আসামিরাও জামিনে রয়েছে।

সেদিনের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে আজও পুরো এলাকায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে।  

শুভর বাবা হালিম কাজী বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার ঘটনায় প্রথমে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করে। পরে আমি রানা মোল্লাকে প্রধান আসামি করে আদালতে মামলা করি। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পুলিশের কাছ থেকে কোনো প্রকার সহযোগিতা পাচ্ছিলাম না, বরং আসামিপক্ষ মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাকে ও আমার পরিবারের লোকজনকে হুমকি দিত। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়। মামলার প্রায় দুই মাস পর আমি কোনো দিশা না পেয়ে সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে নগদ সাত লাখ টাকার মাধ্যমে মামলাটি আপস করি। পুলিশের করা মামলাটিও পরে তদন্তের জন্য সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

জানা যায়, শুভর বাবা মামলা আপস করলেও এ হত্যা মামলায় সিআইডির উপপরিদর্শক শামীম আহমেদ তালুকদার ইতিমধ্যে চার্জশিট দিয়েছেন। তবে তাতে সেই রানা মোল্লার নাম নেই। সেলিম, হুমায়ুন, রাজন, সাদাইরা ও জাকির নামের পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ কেরানীগঞ্জের ১১টি ইউনিয়নে দ্বিতীয় দফায় ইউপি নির্বাচনে ভোট হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি কেন্দ্র ছিল হযরতপুর ইউনিয়নের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভোট শুরু হওয়ার পর সকাল ১১টার দিকে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে সন্ত্রাসী রানা মোল্লার নেতৃত্বে তার বাহিনী কেন্দ্রটি দখল করতে আসে। এলাকাবাসী বাধা দিতে চাইলে রানা মোল্লা তার বন্দুক দিয়ে প্রায় ১৫-২০টি গুলি করে। গুলিতে শুভ কাজী নিহত হয়।

ছেলের কথা মনে পড়লে কেঁদে বুক ভাসান মা সুমনা বেগম। বললেন, ‘ভোটের দিন ছেলেটা বলল, মা, আমি ভোট দেখমু। তোমার লগে আমারে নিয়া যাইবা? যদি ছেলেটারে বাড়িতে রাইখা যাইতাম তাইলে আজ আমার কোল খালি থাকত না। আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইছে এক বছর হইয়া গেছে অথচ খুনিরা ঘুইরা বেড়াইতেছে। ’

গতকাল শুক্রবার সকালে ঢালীকান্দি গ্রামে গেলে কথা হয় স্থানীয় অধিবাসী সরফত আলীর (৮০) সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘মায়ের সঙ্গে সেই ভোট দেখতে গেছিল হালিম কাজীর পোলা শুভ কাজী। কিন্তু ভোট কেন্দ্র দখল করতে আসা সন্ত্রাসী রান্না মোল্লা তার ১০-১২ জন ক্যাডার নিয়া এলোপাতাড়ি গুলি করে। সেই গুলিতেই শুভ মারা পড়ে। ’ 

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জগন্নাথপুর এলাকার রানা মোল্লা ঢাকায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেও সন্ত্রাসী বনে যায়। পরে এলাকায় ফিরে হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। এরপর নিজের বাহিনী তৈরি করে বালু উত্তোলন, নদীর পারের মাটি চুরি, দখল করাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ২০১০ সালে চরজগন্নাথপুর এলাকার সিরাজের বাড়ি দখল করতে না পেরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় তখন তাকে বর্তমান হযরতপুর ইউপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নাল আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে দেন। ২০১৪ সালে হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কমিটি নিয়ে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আলাউদ্দিনকে ছুরিকাঘাত করে রানা মোল্লা। এ ছাড়াও রানা মোল্লার বিরুদ্ধে রয়েছে নারী নির্যাতনসহ একাধিক মামলা।


মন্তব্য