kalerkantho


শিশুদের হত্যা করে ইট বেঁধে লাশ ফেলা হয় নদীতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিশুদের হত্যা করে ইট বেঁধে লাশ ফেলা হয় নদীতে

অপহরণ, হত্যা, লাশ গুমের এই হোতাদের গ্রেপ্তার করে গতকাল সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

চেতনানাশক প্রয়োগ করে শিশু অপহরণ, হত্যা, লাশ গুম ও বিদেশে পাচারকারী সংঘবদ্ধচক্রের হোতাসহ ছয়জন ধরা পড়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে লোমহর্ষক সব তথ্য। এমনকি অপহৃত দুটি শিশুকে হত্যার পর পাথর বেঁধে বুড়িগঙ্গা নদীতে লাশ ডুবিয়ে দেওয়ার স্বীকারোক্তি দিয়েছে তারা।

র‌্যাবের গত দুই দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনের মধ্যে জাকির হোসেন হলো চক্রের হোতা। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলো জাকিরের স্ত্রী মর্জিনা বেগম ওরফে বানেছা, মোহাম্মদ হোসেন সাগর ওরফে বেলু ওরফে দেলু, টিটু, জেসমিন বেগম ও আসলাম আলামিন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি পিস্তল, দুটি ছুরি, একটি চাপাতি, ২৩টি চেতনানাশক ইনজেকশন ও এক হাজার ২০ পিস ইয়াবা।

র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা শিশু-কিশোরদের অপহরণের পর চেতনানাশকের মাধ্যমে অচেতন করে রেখে প্রথমে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চালায়। পরিবার টাকা না দিলে শিশুদের হত্যা করে শরীরে ইট বা পাথর বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। আবার মুক্তিপণ না পেয়ে অপহৃত শিশুকে বিদেশে পাচার করে দেয়। চক্রের সদস্যরা এ পর্যন্ত তিনটি শিশুসহ ছয়জনকে হত্যা, ছয় শিশুকে বিদেশে পাচার এবং মুক্তিপণের টাকা পেয়ে আট শিশুকে ছেড়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।

র‌্যাবের কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে গতকাল বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানান মিডিয়া শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বলেন, গত দুই দিনে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা শিশু অপহরণের উদ্দেশ্যে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ, চিটাগাং রোডের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট এলাকায় ছদ্মবেশে মাইক্রোবাসে ঘুরে বেড়ায়। কোনো শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেখলেই ওরা অপহরণ করে চেতনানাশক দিয়ে অচেতন করে মাইক্রোবাসে তুলে আস্তানায় নিয়ে যায়। এরপর শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চালায়। সেই সঙ্গে তৎপরতা চলে বিদেশে পাচারের।

গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তারা ১৭টি শিশু অপহরণ করেছে। এদের মধ্যে আটজনকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে, ছয়জনকে বিদেশে পাচার করেছে এবং মাত্রাতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করায় দুটি শিশু মারা গেছে। তবে ব্রিফিংয়ে র‌্যাব দাবি করেছে, এই চক্রের সদস্যদের হাতে গত দুই বছরে শিশুসহ ৩০ জন অপহরণের শিকার হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা এ পর্যন্ত দুটি শিশুকে হত্যার পর লাশ বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, গত মাসে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রূপগঞ্জ থানার ভুলতা থেকে আকাশ (১০) ও নাজমুল (৯) নামের দুই শিশুকে অপহরণ করে তারা। জাকিরের (চক্রের সদস্য) বাসায় নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত চেতনানাশক ইনজেকশন প্রয়োগ করায় দুটি শিশুই মারা যায়। পরে মাইক্রোবাসে করে লাশ দুটি কাঁচপুর ব্রিজের ওপর এনে ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আর লাশ দুটি উদ্ধার হয়নি।

চক্রের সদস্যরা স্বীকার করেছে, গত ১ জানুয়ারি তারা এক শিশুকে অপহরণের পর একইভাবে হত্যা করে ডেমরা থানাধীন ঢাকা-চিটাগাং মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড প্রধান সড়কের উত্তর পাশের রাজধানী ফিলিং স্টেশনের পাশের একটি পুকুরে লাশ ফেলে দেয়। পুলিশ ৪ জানুয়ারি সেখান থেকে লাশটি উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় ডেমরা থানায় একটি মামলা হলেও এত দিন পর্যন্ত ওই লাশের পরিচয় অজানা ছিল।

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডেমরা থানার এসআই তৌহিদুল ইসলাম গতকাল র‌্যাবের ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, লাশ উদ্ধারের পর থেকে নিহত শিশুটির পরিচয় শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছিল। এত দিনে জানা গেল, র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত অপহরণকারী চক্রের হাতেই শিশুটি খুন হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, অপহরণকারী চক্রটির কাছ থেকে এ পর্যন্ত বায়েজিদ নামে এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। আর শিশুটিকে উদ্ধারের পরপরই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। গত ৯ জানুুয়ারি নারায়ণগঞ্জ বন্দরের ডালিম নামের একজন র‌্যাব ১১-তে অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে  বায়েজিদ (৮) ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছে। মূলত এ ঘটনার তদন্ত করে চক্রটির সন্ধান পায় র‌্যাব।


মন্তব্য