kalerkantho


আসামি না হয়েও ১৩ বছর মামলার ঘানি

‘অবাস্তব’ শাখাওয়াতের স্থলে ‘বাস্তবের’ শওকত

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হত্যা মামলার আসামি শাখাওয়াত হোসেন। অভিযোগপত্রেও শাখাওয়াত।

তবে তাঁর স্থলে ১১ মাস জেল খেটেছেন শওকত হোসেন। মামলা ঝুলছে ১৩ বছর। এই শওকতই আবার উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন শাখাওয়াত নামে। নিয়মিত আদালতে হাজিরাও দিচ্ছেন। তবে হাজিরাপত্রে কখনো ‘শওকত হোসেন’, আবার কখনো ‘সওকত হোসেন’ হিসেবে সই দেন। বিষয়টি নজরে আসে আদালতের।

আদালত বলছেন, ‘সওকত’ কিংবা ‘শওকত হোসেন’ নামে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। দীর্ঘ ১৩ বছর মামলা চললেও পুলিশও ধরতে পারেনি যে শওকত আসলে শাখাওয়াত নন। আর শওকত নিজে আইনজীবীকে বললেও তিনি বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি।

বরিশালে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা।

তবে বিষয়টি নজরে আসায় বরিশালের দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহা. রকিবুল ইসলাম জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন জেল খাটা ব্যক্তি শাখাওয়াত হোসেন। আদালত তাঁর আদেশে বলেন, তাঁর নিযুক্ত আইনজীবী জসিম উদ্দিন আসামি শাখাওয়াতের স্থলে অন্যজনকে আদালতে হাজির করে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার অপচেষ্টা করেছেন। কিংবা কোনো অদৃশ্য কারণে পুলিশ প্রশাসন প্রকৃত আসামিকে দীর্ঘ ১৩ বছরেও গ্রেপ্তার করছে না। আর তাই শাখাওয়াত, তাঁর আইনজীবী এবং থানার ওসিকে আজ বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেরা শাহজাহান-জাকির হত্যা মামলায় যে শাখাওয়াতকে আসামি করা হয়েছে, ওই নামে কোনো ব্যক্তি এলাকায় নেই। মামলার বাদীও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবু ‘অবাস্তব’ শাখাওয়াতের স্থলে ‘বাস্তবের’ শওকত ১৩ বছর ধরে মামলার ঘানি টানছেন। শওকত নিজে অবশ্য পরিবারের কাছে একসময় বলেছিলেন, জেলে থাকার সময় তাঁকে ভুল নামে ডাকা হতো। কিন্তু বিষয়টি তাঁর আইনজীবী আমলে নেননি।

নেপথ্যের ঘটনা : বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার একসময়ের দুর্ঘর্ষ সন্ত্রাসী শাহজাহান গাজী ওরফে টেরা শাহজাহান। সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির সদস্যরা ২০০৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শহরের নয়াকান্দি এলাকা ঘিরে ফেলে শাহজাহানকে কুপিয়ে হত্যা করে। একই সময় টেরা শাহজাহানের অস্ত্রের আঘাতে জাকির নামের এক ব্যক্তি আহত হয়। ওই ঘটনার ২২ দিন পর সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

জাকির হোসেনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ঘটনার দিনই কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। এতে নিহত শাহজাহানসহ আটজনকে আসামি করা হয়। নগরীর মানিক মিয়া মহিলা কলেজের কর্মচারী নয়াকান্দা গ্রামের আব্দুস সোবাহান ওই মামলা করেছিলেন। এতে ৬ নম্বর আসামি করা হয় ডেফুলিয়া গ্রামের কালু খানের ছেলে শাখাওয়াত নামের এক ব্যক্তিকে। পরে ওই মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই মাহফুজ আলম ২০০৪ সালের ৩১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে শাখাওয়াতের নাম-ঠিকানা একই রেখে ৩ নম্বর আসামি করা হয়। ২০১২ সালের ১০ মে শাখাওয়াতের অনুপস্থিতিতে আদালতে চার্জ গঠন হয়।

যেভাবে শওকত আসামি : ডেফুলিয়া গ্রামের ছেলে শওকত হোসেন। তাঁর চাচাতো ভাই ধলু হাওলাদার। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি। ঘটনার সময় শওকত ছিলেন তাঁর ভাইয়ের চট্টগ্রামের বাড়িতে। এলাকায় এসে শোনেন জাকির হত্যা মামলায় ধলু আসামি। বেশ কয়েক দিন পর এলাকার লোকজনের কাছে শুনতে পান তিনিও (শওকত) আসামি। সেই থেকে শওকত আত্মগোপনে চলে যান। পরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু শওকতের পরিবারের কেউই মামলার নথি দেখেননি।

শওকতের স্ত্রী ফিরোজা বেগম। সম্প্রতি ডেফুলিয়ার বাসায় তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, আদালতে আত্মসমর্পণ করলে দ্রুত জামিনে মুক্তি মিলবে—এই ভাবনায় শওকতকে আদালতে পাঠানো হয়।

ধলু হাওলাদার বলেন, ‘শওকতের বাবা আ. আজিজ হাওলাদার পিডিবিতে চাকরি করতেন। আত্মসমর্পণের পর থেকেই শওকত আমার সঙ্গে আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছেন। শওকত প্রায়ই বলতেন, ভাই আমার নাম, বাবার নাম জেলে রোল কলের সময় ভুল বলত। তবে বিষয়টি আমরা তখন বুঝতে পারেনি। ’

বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আওলাদ হোসেন দিলু বলেন, টেরা শাহজাহান-জাকির হত্যার ঘটনায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা হয়েছিল। ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে ডেফুলিয়া গ্রামের কালু খানের ছেলে শাখাওয়াতের নাম রয়েছে। বাস্তবে এই নামের কোনো ব্যক্তি তাঁর এলাকায় নেই।

আদালতের পর্যবেক্ষণ : টেরা শাহজাহান-জাকির হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি শাখাওয়াত হিসেবেই হাজিরা দিচ্ছিলেন শওকত। ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি নামের স্থানে শওকত হোসেন লেখেন।

বরিশালের দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহা. রকিবুল ইসলাম তাঁর আদেশে বলেন, ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর মামলার শুনানিকালে আদালতের ডকে উপস্থিত আসামিদের মধ্যে মিলিয়ে শওকত হোসেনকে পাওয়া যায়। নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সওকত হোসেন কিংবা শওকত হোসেন নামে কোনো আসামির নাম মামলার এজাহারে নেই। তা ছাড়া পুলিশ রিপোর্টেও ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। অর্থাৎ মামলায় শওকত/সওকত হোসেন নামে কোনো আসামি নেই।

বাদীর বক্তব্য : মামলার বাদী নয়াকান্দা গ্রামের আব্দুস সোবাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী কমিটিতে তাঁর নাম ছিল। পুলিশের নির্দেশে আমি বাদী হয়েছিলাম। তখন কাকে আসামি করা হয়েছে তা দেখে সই করিনি। ’

আইনজীবীর বক্তব্য : আইনজীবী জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযুক্ত শাখাওয়াতই আসলে শওকত। তা না হলে সে কেন আত্মসমর্পণ করল।

ওসির বক্তব্য : কোতোয়ালি থানার ওসি আওলাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাকির হত্যা মামলাটি ২০০৩ সালে দায়ের হয়েছিল। অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছিল ওই ঘটনার পর। তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। আদালত থেকে বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। এক আসামির পরিবর্তে আরেক আসামি ১৩ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছে সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। যে এসআই অভিযোগপত্র দিয়েছেন তাঁকে জবার দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ’


মন্তব্য