kalerkantho


ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো দলাদলিতে বিপর্যস্ত

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো দলাদলিতে বিপর্যস্ত

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের কোন্দলে বিপর্যস্ত ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। সাংগঠনিকভাবে ওয়ার্ড, থানা কমিটির সম্মেলন তো দূরের কথা, খোদ মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের সম্মেলন হচ্ছে না এক যুগের বেশি সময় ধরে।

দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে এ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন কখন হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না শীর্ষপর্যায়ের নেতারাই। কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের নেতারাও চাচ্ছেন সম্মেলন ছাড়াই নেতৃত্বে থাকতে। সম্মেলন না হওয়ার জন্য বিভিন্ন কারণের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের কোন্দলকেই দোষারোপ করছেন অনেকে। এর আগে তিন মাসের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি করার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তিন মাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহ্বায়ক কমিটি ইতিমধ্যে তিন বছর প্রায় আট মাস সময় পার করলেও সম্মেলন হয়নি।

দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০০৩ সালের জুলাই মাসে। ওই সম্মেলনে চন্দন ধরকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল।

সাধারণ সম্পাদক পদে দুজনের নাম ঘোষণা করলে নগরের লালদীঘি মাঠে ওই সময় যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর দেড় বছর পর কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে চন্দন ধর সভাপতি ও মশিউর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৩ সালের ২৪ জুন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ৪১ লাখ টাকার দরপত্রকে কেন্দ্র করে সিআরবি এলাকায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিবদমান দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এক পথচারি শিশু আরমান ও যুবলীগকর্মী সজল পালিত নিহত হন। এ ঘটনার ১৬ দিন পর ২০১৩ সালের ১১ জুলাই কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কমিটি ভেঙে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহ্বায়ক করে ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা ছিল তিন মাসের মধ্যে এই আহ্বায়ক কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি করার।

অভিযোগ রয়েছে, আহ্বায়ক কমিটির কেউ কেউ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। আর সেই স্বার্থরক্ষায় নেতৃত্ব ছাড়তে চাচ্ছেন না নেতারা। অনেকে বলছেন, কোন্দলের কারণে সংঘাতের আশঙ্কায় সম্মেলন হচ্ছে না। আবার কেউ বলছেন, বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি চাচ্ছেন না সম্মেলন হোক। আহ্বায়ক কমিটির একাংশ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে, অন্য অংশ সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে আমরা সম্মেলন করতে পারিনি। আমাদের সম্মেলন করার মতো প্রস্তুতি আছে। রাজনৈতিক অভিভাবকদের দিকনির্দেশনা পেলে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ভালো থাকলে আমরা যেকোনো সময় সম্মেলন করতে পারি। ’

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। অ্যাডভোকেট এইচ এম জিয়াউদ্দিন আহ্বায়ক ও তিনজনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যের ওই কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। ইতিমধ্যে ১৫ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু সম্মেলন করতে পারেনি এই আহ্বায়ক কমিটি।

মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কে বি এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে আমরা সম্মেলন করতে পারিনি। দীর্ঘদিন পদে থাকতে চাই না। কয়েক দফা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সম্মেলন করতে পারিনি। তবে আমাদের কারণে সরকারের কোনো সময় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়নি। ’

একই কমিটির আহ্বায়ক এইচ এম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো থাকলে মাস দুয়েকের মধ্যে সম্মেলন করে ফেলব। ’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহিলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ওই সম্মেলনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। এর আগে ১৯৮৩ সালে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের উপস্থিতিতে নগরের মুসলিম হলে প্রথমবার সম্মেলন হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরে। ওই সম্মেলনে নিলুফার কায়সার সভাপতি (প্রয়াত), তপতী সেনগুপ্তকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮৩ সদস্যের মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের একটি কমিটি হয়েছিল। সে কমিটির মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সহধর্মিণী হাসিনা মহিউদ্দিনকে প্রায় ১৫ বছর আগে মহানগর মহিলা লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে প্রথম সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত কমিটির সহসভাপতি নমিতা আইচ ও সাধারণ সম্পাদক তপতী সেনগুপ্ত আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে। দুই পক্ষ বিভিন্ন সময় আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছে।

এ ব্যাপারে নমিতা আইচ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করলেও কোন্দলের কারণে সম্মেলন হয়নি। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে হাসিনা মহিউদ্দিন সভাপতি হননি। তাই আগের কমিটি বহাল। আমরা চাই সম্মেলনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হোক। ’

তপতী সেনগুপ্ত বলেন, ‘১৯৯৮ সালে দ্বিতীয়বার সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। আগের কমিটি বহাল আছে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে বিরোধ না মিটলে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ’

মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অন্যদিকে এক যুগ আগে চট্টগ্রাম মহানগর শ্রমিক লীগের ৪১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হলেও অনুমোদন দেয়নি কেন্দ্রীয় কমিটি।


মন্তব্য