kalerkantho


অনাচারে ধুঁকছে নিঝুম দ্বীপ

আরিফুর রহমান, নিঝুম দ্বীপ থেকে ফিরে   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অনাচারে ধুঁকছে নিঝুম দ্বীপ

গাছ কেটে ফেলায় শ্রীহীন হয়ে পড়েছে নিঝুম দ্বীপ। ছবি : কালের কণ্ঠ

সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়সহ যতবার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হেনেছে, ততবারই বুক চিতিয়ে রক্ষাকবচ হয়েছে নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ সবুজ বেষ্টনী। ৮১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত যে দ্বীপ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে বিপদ-আপদ থেকে মায়ের মতো আগলে রাখে, সে দ্বীপের সবুজ বেষ্টনী এখন অস্তিত্ব সংকটে।

পঞ্চাশের দশকে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা অপরূপ সৌন্দর্যের নিঝুম দ্বীপ এখন অনেকটা নিষ্প্রাণ-শ্রীহীন।

পুরো এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে বনের গাছ কাটার মহোৎসব। একসময় যেখানে বন বিভাগের মাধ্যমে সাড়ে ১২ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বাগান করা হয়েছিল, সেটি কমতে কমতে সাড়ে তিন হাজার একরে নেমে এসেছে। নিঝুম দ্বীপে চিত্রা হরিণের খাবার কেওড়াগাছের পাতা। বনের গাছ কাটতে কাটতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে হরিণের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বনের ভেতর শিকারের পাশাপাশি চলছে অবাধে হরিণপাচার। বন কেটে স্থানীয়দের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। আর এসব অপকর্মে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মেহরাজউদ্দিন। তাঁর ভয়ে স্থানীয়রা অসহায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।  

এ তো গেল নিঝুম দ্বীপের ভেতরের অবস্থা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দ্বীপে যাওয়ার পথও ততটা মসৃণ নয়। সড়কপথের অবস্থা করুণ। যাওয়ার পথে দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়তে হয় পর্যটকদের। সড়কপথে ননচিরা ঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপ পর্যন্ত দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি রাস্তা খানাখন্দে ভরা। আর লঞ্চে গেলে তমরদি ঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপের ২৮ কিলোমিটার রাস্তার পুরোটাই বেহাল।

নিঝুম দ্বীপের জাহাজমারা রেঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মাটিতে কেওড়াগাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। আবার কোথাও কোথাও কৌশলে কেওড়াগাছের নিচে শ্বাসমূল কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, যাতে করে ধীরে ধীরে গাছ মারা যায়। লবণাক্ততার কারণে নিঝুম দ্বীপে শুধু কেওড়াগাছ হয়। আর এই গাছের দাম খুবই কম। তাই গাছ বিক্রির দিকে কারো মনোযোগ নেই। সবার নজর গাছ কেটে সেখানে বসতি গড়ে তোলা। বনের গাছ কেটে সেখানে গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতভিটা।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন বিভাগের জমি জবরদখল করে নিঝুম দ্বীপে বর্তমানে পাঁচ হাজার পরিবার বসবাস করছে। পাঁচ হাজার পরিবারে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বন বিভাগের জমির ওপর অবৈধভাবে বসবাস করছে। বিভিন্ন সময়ে মামলা করলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আরো বলেন, ‘স্থানীয় চেয়ারম্যান মেহরাজউদ্দিন সাধারণ জনগণকে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মারধর করতে উসকে দেন। ’ 

জানতে চাইলে জাহাজমারা রেঞ্জের নিঝুম দ্বীপ বিটের বন কর্মকর্তা নূরে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আমাদের নিজস্ব জনবল অত্যন্ত কম। স্বল্প জনবল নিয়ে আমরা বেশ কয়েকবার বন বিভাগের জমি ফিরে পেতে উচ্ছেদে বের হয়েছি। কিন্তু স্থানীয়রা উল্টো একজোট হয়ে আমাদেরকে মারতে আসে। সম্প্রতি আমাকে মারধর করেছে। ’

নূরে আলম বলেন, বন বিভাগের জমি দখল ও গাছ কাটার সঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যান মেহরাজউদ্দিন সরাসরি জড়িত। চেয়ারম্যান স্থানীয়দের জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন মেহরাজ।

বন বিভাগের জমি দখল ও গাছ কাটার সঙ্গে চেয়ারম্যান মেহরাজউদ্দিন যে জড়িত, এর প্রমাণ মিলল উপজেলা পরিষদ থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো একটি প্রতিবেদনে। তাতে নিঝুম দ্বীপের বন দখল, স্থানীয়দের বসতভিটা তৈরিতে সহযোগিতা ও গাছ কাটার সঙ্গে মেহরাজউদ্দিনের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সহযোগী সালাহউদ্দিন, বেলাল সর্দার, রাসেল, জুম্মা ডাকাত ও জহিরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেহরাজের ছোট ভাই শাহরাজ ও সোহরাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

তবে জানতে চাইলে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেহরাজউদ্দিন উল্টো অভিযোগ করে বলেন, ‘জনগণ আমার। বনের দায়িত্ব বন বিভাগের। আর বন বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা না করে একটি ঘর তোলাও সম্ভব নয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা টাকা খেয়ে বন দখলের সুযোগ করে দেয়। আর অভিযোগ তোলে আমার ওপরে’।

কথোপকথনের একপর্যায়ে মেহরাজউদ্দিন বলেন, ‘বিএনপি সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি অবৈধ বন দখল হয়েছে। আমি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কিছুটা বন দখল ও গাছ কাটা হয়েছে। ’  দুদকের একটি মামলায় সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মেহরাজউদ্দিন আরো বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি। তাই আমার অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আছে। তারাই এসব গুজব ছড়ায়। ’ 

জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুব মোর্শেদ লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিঝুম দ্বীপে আপনি পর্যটন বিকাশ আর মানুষকে জায়গা দেওয়া—এ দুটি একসঙ্গে করতে পারবেন না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পর্যটন বিকাশ করা সম্ভব নয়। সংরক্ষিত বন থেকে জনগণকে সরিয়ে বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ’ বন বিভাগের জমি রক্ষায় সেখানে কোস্ট গার্ড, র‌্যাব, নৌ পুলিশের সমন্বয়ে একটি ক্যাম্প গঠনের কথা বলেন মাহবুব মোর্শেদ।

সড়কের বেহাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজেট কম। নিজস্ব বাজেট দিয়ে এত বড় কাজ করা সম্ভব নয়। বিমানমন্ত্রীর কাছে নিঝুম দ্বীপের সড়ক উন্নয়নে টাকা চেয়েছি। আশা করছি শিগগিরই কাজ শুরু হবে। ’

সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সব পক্ষ একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নিঝুম দ্বীপে কতটুকু বন থাকবে, আর কতটুকু জায়গায় বসতি থাকবে। এটি ঠিক করতে না পারলে একসময় পুরো বনই বসতভিটায় রূপ নেবে। ’


মন্তব্য