kalerkantho


ক্যাপ্টেন হুদা থেকে সিইসি

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ক্যাপ্টেন হুদা থেকে সিইসি

রণাঙ্গনে তুখোড় যোদ্ধা ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। লড়াই করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন। নিজে সামনে থেকে যুদ্ধ করেছেন একই সঙ্গে সংগঠিত করেছেন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন তরুণদের। প্রতিদান হিসেবে তাঁকে পটুয়াখালীর একাংশের প্রশাসনিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁর এমন অবদান তিনি কে এম নুরুল হুদা। সহযোদ্ধারা তাঁকে ক্যাপ্টেন হুদা নামেই চিনতেন। সেই ক্যাপ্টেন হুদা এবার দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা গ্রামে ১৯৪৮ সালে কে এম নুরুল হুদা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আব্দুর রশিদ খান। কে এম হুদার আরো দুই ভাই আছেন।

আবু তাহের খান আমেরিকা প্রবাসী। তবে স্ত্রী নিয়ে এখন বসবাস করেন গ্রামের বাড়িতে। ছোট ভাই কে এম নাসির উদ্দিন। তিনিও থাকেন গ্রামের বাড়িতে। নওমালা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, হুদার বাবা ছিলেন নওমালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাবার হাত ধরেই সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরে পাশের বগা হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন পটুয়াখালী সরকারি কলেজে। কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হুদা পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাড়ি জমান তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে হুদা ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটি সফল অপারেশনের পর তাঁকে পটুয়াখালী-গলাচিপা ইউনিটের ইউনিট কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।   

গলাচিপার পানপট্টিতে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা। সেখানে বিরতিহীন ১৩ ঘণ্টা যুদ্ধ করে সহস্রাধিক পাকিস্তানি সেনাকে হটিয়ে মুক্ত করা হয় পানপট্টি এলাকা। পরবর্তী সময়ে পটুয়াখালী জেলা মুক্ত করার ক্ষেত্রে নুরুল হুদা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা ইউনিয়নে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। ওই ক্যাম্পে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানো হতো। একাধিকবার নুরুল হুদার বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলাও করেছিল।   হুদার নেতৃত্বে অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান শওকত যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধকালে তিনি ছিলেন পটুয়াখালী-গলাচিপা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হাবিবুর রহমান শওকত বলেন, তুখোড় যোদ্ধা ছিলেন কে এম নুরুল হুদা। তিনি আরো বলেন, হুদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে থাকতেন। তাঁর রুমে বসে ১৯৭২ সালে জাসদের ৯ সদস্যবিশিষ্ট পটুয়াখালী জেলা ইউনিটের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে সদস্য হিসেবে তাঁর নাম ছিল। তবে সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেননি। এ ছাড়া কমিটি গঠনের পরের বছর তিনি চাকরিতে যোগদান করেন।

পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল বারেক বলেন, নুরুল হুদার নেতৃত্বে একটি বাহিনী ছিল। আমরা ক্যাপ্টেন হুদা বাহিনী বলেই চিনতাম। সেই বাহিনী পানপট্টি, শরণখোলা, কলাপাড়া ও গলাচিপায় একাধিক সম্মুখযুদ্ধ করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকত। পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার নির্মল কুমার রক্ষিত বলেন, পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠানে হুদা নিজ গ্রামের বাড়িতে আসেন। ফলে তাঁর সঙ্গে সাধারণের সুসম্পর্ক আছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি সৎ ও পরিশ্রমী। হুদার প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বলেন, ঈদ-কোরবানিতে তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই এলাকাবাসী তাঁকে চেনে। তিনি কখনো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

নুরুল হুদার ছোট ভাই নওমালা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এম নাসির উদ্দিন বলেন, নুরুল হুদা কখনই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে ছাত্রজীবনে আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। হুদা ১৯৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি কর্মকমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ওই বছরের ৩০ জুলাই প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। স্ত্রী হুসনে আরা আর তিন ছেলেমেয়ের সংসার তাঁর। বড় ছেলে প্রকৌশলী কামরুল হুদা খান কানাডায় আছেন। মেজ মেয়ে সাদিয়া পারভীন লুনা বুয়েট থেকে পাস করে পিএইচডি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিগানে থাকেন। ছোট মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।


মন্তব্য