kalerkantho


ইউনেসকো গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৬

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি ছাড়া শিক্ষায় এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়

বাড়তি ব্যয় মেটাতে জ্বালানি-ভর্তুকি প্রত্যাহারের পরামর্শ

শরীফুল আলম সুমন   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি ছাড়া এসডিজি-৪ (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস-৪) অর্জন সম্ভব নয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৬-তে এ কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে এ বাবদ বার্ষিক ব্যয় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শিক্ষায় অর্থের সংস্থান করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর জোর দিতে হবে। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর পক্ষে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। এ জন্যই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি খুব দরকার।

শিক্ষাবিষয়ক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) অর্জনে বৈশ্বিক অংশীদারির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নীতি-সমন্বয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানো সম্ভব হলেও ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি থেকে যাবে। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমেই মেটাতে হবে।

শিক্ষায় বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য কর বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি-ভর্তুকি প্রত্যাহারের পরামর্শ দিয়েছে ইউনেসকো। অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে শিক্ষা তহবিল গঠন করে শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি-ভর্তুকি সংস্কার করে ইন্দোনেশিয়া ২০০৫-০৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষায় সরকারি ব্যয় ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

গত রবিবার ঢাকায় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ই-নাইনভুক্ত ৯ দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন। এই ৯টি দেশে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের বাস। এসব দেশের বয়স্ক লোকদের ৭০ শতাংশই নিরক্ষর। সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় এসডিজি-৪-এর শর্ত পূরণ। জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা উচিত বলে তাঁদের অভিমত।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জানুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ তৈরিতে জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

শিক্ষাবিষয়ক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি-৪-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। এ সময়ে সবার জন্য বিনা মূল্যে সমমানের মাধ্যমিক শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, ছেলে-মেয়ের জন্য সমমানের ও সুলভ কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ প্রভৃতি সাতটি লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এসব অর্জনের তিনটি পথও দেখানো হয়েছে।

ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব লক্ষ্য অর্জনে বড় প্রতিবন্ধকতা অর্থায়নের অপ্রতুলতা। তাই বাড়তি বিনিয়োগ দরকার। বৈশ্বিক পর্যায়ে শিক্ষা-সহায়তা দিন দিন কমছে। ধনী দেশগুলো ২০০৯ সালে যে পরিমাণ সহায়তা দিয়েছিল, গত বছর তার চেয়ে কম দিয়েছে। স্বল্প আয়ের দেশগুলোর শিশুদের শিক্ষার জন্য তারা বছরে মাথাপিছু মাত্র পাঁচ ডলার সহায়তা দিয়ে থাকে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জেফরি ডি স্যাকস বলেন, এটি দুঃখজনকভাবে কম। ধনী দেশগুলো যদি মনে করে থাকে স্বল্প আয়ের দেশে নামমাত্র শিক্ষা-সহায়তা দিয়ে তারা অর্থ বাঁচাচ্ছে, তাহলে ভুল হবে। কারণ টেকসই উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ বিশ্বের মঙ্গলের জন্যই জরুরি।

ইউনেসকো বলেছে, সম্পদশালী কয়েকটি দেশ যদি তাদের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ০.৭ শতাংশ সহায়তা দেয় এবং সে সহায়তার ১০ শতাংশ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করে, তাহলে এসডিজি-৪ অর্জনে আর্থিক ঘাটতি পূরণ হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষায় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে করতে হলে মোট অভ্যন্তরীণ আয়ের (জিডিপি) ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। স্বল্প আয়ের বেশির ভাগ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশের নিচে। ফলে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে শিক্ষার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন। কর ফাঁকি রোধের উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে।

বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটের ১৪.৩৯ শতাংশ। এর পরিমাণ ৪৯ হাজার ৯ কোটি টাকা। গত ১০ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বরাদ্দ। তবে বরাদ্দের বেশির ভাগ অনুন্নয়ন খাতে অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে এ বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা কাজ করা যাচ্ছে না। শিক্ষাবিদরা বলছেন, কমপক্ষে ২০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এসডিজি-৪-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রথমত শিক্ষায় জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে। বেসরকারি অংশীদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষা নিয়ে সরকারের জাতীয় পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেখানে সরকার কতটুকু করবে আর বেসরকারি খাত কতটুকু করবে, তা ঠিক করতে হবে। তবে প্রাথমিক খাতের পুরো দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকের আরো ক্ষমতায়িত করতে হবে।


মন্তব্য